শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৮ অপরাহ্ন
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনা ও নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ নৌযান চলাচলে নির্দিষ্ট নৌ-নির্দেশনা সেবার বিনিময়ে স্বেচ্ছাভিত্তিক ফি চালুর একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে। আলোচনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সমর্থন মিললে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে এবং এটি বাধ্যতামূলক হবে না।
ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাধ্যতামূলক টোল আরোপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী মালাক্কা প্রণালি ও ইংলিশ চ্যানেলের মতো নির্দিষ্ট নৌ-সেবা বাবদ অর্থ নেওয়ার মডেল হরমুজেও বিবেচনার পক্ষে মত দিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এবং নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা হবে—এমন একটি প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন জটিল হয়ে উঠেছে। তবে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত নীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্তে দেশটির নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তী চুক্তির কার্যকারিতা শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা জানান এবং নিজের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে ইরানকে কঠোর সতর্কবার্তা দেন।
অন্যদিকে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে বলেন, তার বাবার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং এটিকে তিনি জাতির ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে ওমান মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক ব্যবস্থাপনার আদলে একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রস্তুত ওই প্রস্তাব ব্যাখ্যা করতে তেহরানে বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর আগ্রহও প্রকাশ করেছে দেশটি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালি ও নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য ওমান সফর করবেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও আশা প্রকাশ করেছেন, ইরান ও ওমানের মধ্যে এ বিষয়ে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
এরই মধ্যে ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র পূর্ববর্তী সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন করেছে। তেহরানের দাবি, ইরানের তেল মার্কিন ডলারে বিক্রির ক্ষেত্রে যে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করেছে ওয়াশিংটন।
হরমুজ প্রণালির অধিকাংশ নৌপথ ওমানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় দেশটি বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি আরোপের বিরোধিতা করেছে। কাতারও বলেছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন উপেক্ষা করে কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ভেতরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুসরণ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। একটি অংশ সহযোগিতার পক্ষে থাকলেও অন্য অংশ এতে অনাগ্রহী বলে জানা গেছে।
লন্ডনে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) কাউন্সিল বৈঠকে ওমানের প্রতিনিধি খামিস বিন মোহাম্মদ আল শামাখি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ-চলাচলের অধিকার নিশ্চিত রয়েছে এবং বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি আরোপের সুযোগ নেই। তবে নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় স্বেচ্ছাভিত্তিক সহায়তা সেবা চালুর বিষয়টি আলোচনাযোগ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও ইউরোপীয় রাষ্ট্র আইএমওতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেও রাশিয়া ও চীন তা সমর্থন করেনি। রাশিয়ার মতে, প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণ বিবেচনায় নেয়নি। চীনও এটিকে একপেশে এবং আইএমওর এখতিয়ারের বাইরে বলে মন্তব্য করেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু দুটি বিষয়। প্রথমত, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে সচল হওয়ার পর এর পরিচালনা কাঠামো কী হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক মডেল হরমুজে প্রয়োগযোগ্য হবে কি না।
গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান ৬০ দিনের জন্য অতিরিক্ত চার্জ ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করেছে, এর অর্থ এই নয় যে ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মে মাসের শুরু থেকে তাদের বাহিনী ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করেছে, সমঝোতা অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব তারা পালন করেছে এবং প্রণালিতে বিদেশি বাহিনীর ভূমিকার প্রয়োজন নেই।