শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৯ অপরাহ্ন
দেশে অনলাইন মাদক নেটওয়ার্ক দ্রুত বিস্তার লাভ করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার হচ্ছেন বাহক ও খুচরা বিক্রেতারা। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই অপরাধে জড়িত মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়কারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে তল্লাশি চৌকি স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই অভিযানে গাঁজা, ইয়াবা, আইস, কোকেনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার হচ্ছেন মাদক বহনকারী ও খুচরা পর্যায়ের কারবারিরা। তবে এসব পদক্ষেপের পরও মাদকের বিস্তার কমছে না; বরং কারবারের ধরন দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, প্রচলিত পাচারপদ্ধতির পরিবর্তে এখন ডার্ক ওয়েব, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের ক্লোজড গ্রুপ, ভার্চুয়াল নম্বর, এনক্রিপ্টেড ক্লাউড ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মাদক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে। অর্ডার দেওয়া হচ্ছে এনক্রিপ্টেড মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে, মূল্য পরিশোধ হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে এবং সরবরাহ এমনভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে যাতে ক্রেতা ও বিক্রেতার সরাসরি দেখা করার প্রয়োজন না পড়ে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নেটওয়ার্কের মূল হোতারা আড়ালে অবস্থান করায় অভিযানে সাধারণত ধরা পড়েন ডেলিভারিম্যান, বাহক অথবা স্থানীয় খুচরা বিক্রেতারা। কিন্তু অর্থায়নকারী, সমন্বয়কারী এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষাকারীরা অনেক ক্ষেত্রেই অধরাই থেকে যান।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রচলিত তদন্তপদ্ধতি দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর মাদক অপরাধ মোকাবিলা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বর্তমানে শুধু মাদক উদ্ধার নয়, এনক্রিপ্টেড চ্যাট, ডিজিটাল ওয়ালেট, আইপি ঠিকানা, ক্লাউড ডেটা, ব্লকচেইন লেনদেন এবং ডার্ক ওয়েবের তথ্য বিশ্লেষণও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এখনো সীমিত।
ডিএনসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনভিত্তিক মাদক কারবার প্রতিরোধে সংস্থাটির প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে অভিযান পরিচালনায় ব্যস্ত থাকায় প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ফলে অনলাইনে মাদক লেনদেনে অপরাধীদের আগ্রহ বাড়ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা গণমাধ্যমকে বলেন, কেবল অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ডিএনসির নিজস্ব সাইবার ইন্টেলিজেন্স ও ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন সেল গঠন জরুরি। সেখানে ডিজিটাল ফরেনসিক, ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স, ডার্ক ওয়েব মনিটরিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্র্যাকিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণে দক্ষ জনবল প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ, সিআইডি, সিটিটিসি, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা তথ্য অনলাইন মাদক চক্র শনাক্তে সবচেয়ে কার্যকর।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একসময় সীমান্তপথে মাদক প্রবেশই ছিল সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। এখন তদন্তকারীদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অর্ডার কোথা থেকে দেওয়া হয়েছে, অর্থ কীভাবে পরিশোধ হয়েছে এবং যোগাযোগ কোন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হয়েছে—এসব বিষয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ডার্ক ওয়েব ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবহার করে এলএসডি, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ডিওবি, কেটামিনসহ উচ্চমূল্যের সিনথেটিক মাদকের কারবার বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ডার্কনেট মার্কেটপ্লেসে বিশেষ ব্রাউজারের মাধ্যমে অর্ডার দিয়ে বিটকয়েনসহ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য পরিশোধ করা হয়। পরে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সাধারণ চিঠিপত্র, বই কিংবা ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের মধ্যে বিশেষ কৌশলে মাদক আনার চেষ্টা করা হয়। দেশে পৌঁছানোর পর ফেসবুক, টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম অথবা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে নির্ধারিত ক্রেতার কাছে হোম ডেলিভারি বা গোপন স্থানে সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় পরিচালিত এক অভিযানে ডিএনসি একটি গোপন কেটামিন উৎপাদন ল্যাবের সন্ধান পায়। অভিযানে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কেটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক কাঁচামাল এবং ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এ সময় ইয়াং চুংসেন, ইউ জি ও লি বিন নামে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীরা তাদের অনলাইন যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং ডার্ক ওয়েবসহ অন্যান্য এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের বিষয়গুলোও যাচাই করছেন। তাদের ধারণা, ঘটনাটি বৃহত্তর আন্তঃদেশীয় সিনথেটিক মাদক নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে।
ডিএনসির আরেক তদন্তে উঠে এসেছে, এমডিএমবি চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেস হিসেবে ব্যবহার করছিল। ফেসবুকের ক্লোজড গ্রুপ, ভুয়া আইডি এবং রিভিউ পেজে সাংকেতিক ভাষার পোস্ট দিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হতো। পরে তাদের এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে নিয়ে গিয়ে কোডওয়ার্ড, ইমোজি ও লাইভ লোকেশন ব্যবহার করে লেনদেন ও সরবরাহের ব্যবস্থা করা হতো। তদন্তকারীরা জব্দ করা ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত আরও ব্যক্তিকে শনাক্তের চেষ্টা করছেন।
ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক কারবারের ধরন বদলে যাওয়ায় তদন্ত পদ্ধতিও পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এখন একটি মোবাইল ফোন জব্দ করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগের সূত্র উদ্ধার, ক্লাউডভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, ডিজিটাল ওয়ালেটের লেনদেন বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে বিদেশি সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময়। তবে এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হওয়ায় তদন্তে সময় লাগছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর মাদক অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা, আধুনিক ল্যাব এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, সাইবার তদন্তকারী ও মাদক গোয়েন্দাদের সমন্বয়ে বিশেষায়িত সাইবার নারকোটিক্স ইউনিট গড়ে তোলা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্বয়ংক্রিয় বট, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ এবং বিকেন্দ্রীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে অপরাধীদের সঙ্গে ব্যবধান আরও বৃদ্ধি পাবে।