বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ১২:১২ অপরাহ্ন
৭৭ হাজার টাকায় কোটি টাকার কাজ! রহস্য কোথায়?
অনলাইন ডেস্ক
একদল স্বেচ্ছাসেবী কিনা, নাকি বইয়ের মান যাচাইবিহীন একটি দুর্নীতির মহোৎসব? ছাত্র ও কিশোরদের হাতে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ছাপানো বইয়ের মান যাচাইকারীদের নিয়োগের মাধ্যমে চলছে এক বিস্ময়কর প্রতিযোগিতা। সাধারণ দপ্তরে কয়েক কোটি টাকার কাজ ৭৭ হাজার টাকায় নিতে মার্চেন্টদের একটি সিন্ডিকেট গঠন করেছে—এদের কেউ বিনামূল্যে কাজ দেবে, কেউ আবার পাঁচ কোটি ঘুষের বিনিময়ে এককল্যাণী কাজ নেওয়ার তোহফা পেয়ে বসেছেন।
২০১৬ সালে প্রাথমিক স্তরের বইয়ের মান যাচাইয়ে ৩.৫ কোটি টাকায় কাজ করেছিল একটি পরিদর্শন এজেন্সি। আজ, সেই একই কাজ চলছে মাত্র ২৯ লাখ টাকায়—ব্যয় যেখানে হওয়া কথা ৭২–৭৫ লাখের মতো। মাধ্যমিক স্তরেও দেড় কোটি টাকার কাজ এখন নেমেছে ১০ লাখ টাকায়। এমন অগ্নিমূল্যের দরপত্রে কেন এমন তীব্র প্রতিযোগিতা? কথাচ্ছলে বলা হচ্ছে, ‘পরিদর্শন এজেন্সি পাওয়া মানে আলাদীনের চেরাগ পাওয়া’।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রতিবছর ৩০ কোটি টাকারও বেশি বই ছাপা ও মান যাচাইয়ের জন্য তৃতীয় পক্ষকে নিয়োগ দেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের মাধ্যমিকের পিডিআই দরপত্রে সবচেয়ে কম দামে দর দেওয়া প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে কাজ, অথচ ষষ্ঠ দরদাতাকে কাজে নিয়েছে এনসিটিবি। এতে সরকারের ২৯ লাখ টাকা পার্ড করেছে। অভিযোগ উঠেছে, ওই প্রতিষ্ঠান বিদেশি হলেও প্রিন্টার্সের সঙ্গে যোগসাজশে নিম্নমানের বই ‘ভালো’ বলে ছাড়পত্র দেয়।
পিএলআইর ক্ষেত্রেও শোচনীয় অবস্থা: ৭৭ হাজার টাকায় জেলা থেকে বই সংগ্রহ, ল্যাবে পাঠানো ও যাচাই—সব কিছুর কাজে এতই কম মূল্য! অভিযোগ, দুই দফায় প্রকৃত অভিজ্ঞতাবিহীন প্রতিষ্ঠান ফলছিল পছন্দ। পিতৃতান্ত্রিকভাবে কাজ দেওয়ার ফলে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিচারহীনতা ছড়িয়েছে। ৮–১০টি প্রতিষ্ঠানের একটি সিন্ডিকেট হয়ে নিয়েছে এ কাজের মালিক। এদের মধ্যে ফরাসি ফার্ম ‘ব্যুরো ভ্যারিটাস’ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে ৩০ লাখ টাকার দরদানীতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানে।
এ ঘটনায় এনসিটিবি গঠন করেছে দুটি তদন্ত কমিটি। তাদের রিপোর্ট অনুসারে, পিএলআই পদ্ধতি বাতিল করে নতুন উপায় নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এনসিটিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, “পরিদর্শন কাজে একদমই ‘মধু’ নেই। কিন্তু অনেকেই বিনা পয়সায় কাজ করতে চায়—এতে স্পষ্ট দুর্নীতির গন্ধ।” তিনি জানান, অধিদপ্তর এখন কঠোর শর্ত রাখছে এবং পিএলআই পদ্ধতি বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
২০২৩ সালে পিএলআইর জন্য নির্দিষ্ট মূল্য ছিল মাত্র ৭৭ হাজার। এই কাজ ধরা পড়ে দুদক ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ে অভিযোগে, যেখানে এনসিটিবির সচিবকে এক কোটি টাকার ঘুষের তথ্যও উঠে। প্রশ্ন উঠেছে—কীভাবে বিল আটকে ৩০০ কোটি টাকা? বড় প্রিন্টারদের প্রতি এই অর্থ প্রতিশ্রুতির শাখার ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি হিসেব বলছে, প্রতি বইয়ের বিএসটিআই পরীক্ষা ৫৫১ টাকা, পাঁচ হাজার বই মান পরীক্ষা করলে খরচ পড়বে ২৬ লাখ টাকা। কিন্তু বেতন-ভাতা, অফিস-ল্যাব আর অতিরিক্ত খরচ মিলিয়ে ৭২–৭৫ লাখে কাজ হওয়া উচিত—কিন্তু হচ্ছে সাড়ে ২৯ লাখে! প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে এত কম খরচ নিয়েই মানসম্মত কাজ সম্ভব?
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী দফতর, দুদক ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কাছে অভিযোগ আছে। এনসিটিবির বর্তমান বিতরণ শাখা সরাসরি সিন্ডিকেটের সহযোগিতাকে উৎসাহ দিচ্ছে—অন্যথায় নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো কোনভাবেই কাজ পায় না।
গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, ‘ভ্যাট, ডিউটি তুলে দিয়ে এরা বছরে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করছে।’ অথচ শিক্ষার্থী-অনূভূত মনোনফলনের আলোকে বিনা পয়সায় প্রস্তুত খাটতে তৎপর এ সিন্ডিকেট—এটা কি রূপকথার আলাদীনের জাদু নয়?