শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৫৫ পূর্বাহ্ন
“ভালো ফল সম্ভব, তবে তা হবে চ্যালেঞ্জিং”—ভারতের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজ নিয়ে ঢাকা ত্যাগের আগে ঠিক এমনটাই বলেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। অনেকের কাছে মনে হতে পারে, দুই টেস্টের সিরিজ নিয়ে তিনি হয়তো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী না, বিশেষ করে পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে ধবলধোলাই করার পর। এ পর্যায়ে তাঁর বক্তব্যে হয়তো আরও আত্মবিশ্বাসের ছাপ আশা করা যেত। কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন ভারত, তখন পরিস্থিতি ভিন্ন।
রোহিত শর্মার নেতৃত্বাধীন দল শুধু দ্বিতীয় সেরা টেস্ট দল নয়, বরং ঘরের মাঠে প্রায় অপরাজেয়। আর বাংলাদেশের জন্য স্মৃতি হয়তো কিছুটা কষ্টের, কারণ গত সিরিজে দুই টেস্টেই ভারতের মাটিতে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। সব কিছু বিবেচনায়, এ সিরিজ নিয়ে বাংলাদেশের উচ্ছ্বাসের জায়গা সীমিত। তবুও পুরোপুরি হতাশা নয়, কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। যেমন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা প্রতিপক্ষের মাঠে ভালো পারফর্ম করছে, যা এই সিরিজে ব্যাটিংয়ে উন্নতির আশা জাগাচ্ছে। অন্যদিকে, ভারতের মাটিতে বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের গ্রাফও ধীরে ধীরে নিম্নমুখী।

২০২১ সাল থেকে চলতি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ দলের ১ থেকে ৭ নম্বর ব্যাটসম্যানদের অ্যাওয়ে পারফরম্যান্স পূর্ববর্তী চার বছরের তুলনায় (২০১৬-২০২০) উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। এমনকি, এ সময়ে অ্যাওয়ে ম্যাচে তাদের গড় রান ঘরের মাঠের চেয়েও বেশি ছিল।
২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ১১টি অ্যাওয়ে টেস্ট খেলেছে। এই ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশের শীর্ষ সাত ব্যাটসম্যানের গড় ছিল ৩৩.৩৬, যা ২০১৬-২০ সময়ে ছিল মাত্র ২৭.৬৭। একই সময়ে ঘরের মাঠে খেলা ১৪ টেস্টে তাদের গড় ছিল ৩২.০৩। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স উন্নত হয়েছে।
এই সাফল্যের পেছনে তিন ব্যাটসম্যানের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তামিম ইকবাল ৫টি অ্যাওয়ে টেস্টে ৪৯ গড়ে ৪৪১ রান করেছেন, যদিও ২০২২ সালের পর তিনি কোনো অ্যাওয়ে টেস্ট খেলেননি। মুশফিকুর রহিম ৮টি ম্যাচে ৪৫.১০ গড়ে ৪৫১ রান করেছেন, যেখানে একটি সেঞ্চুরিও রয়েছে। আর লিটন দাস ১১টি অ্যাওয়ে ম্যাচে সর্বাধিক ৭৪২ রান তুলেছেন, গড় ছিল ৪৩.৬৪। এ ছাড়া মুমিনুল হক ১০ ম্যাচে ৩৩.৮১ গড়ে ৫৪১ রান, সাদমান ইসলাম ৬ ম্যাচে ৩৩.৬০ গড়ে ৩৩৬ রান এবং নাজমুল হোসেন ১১ ম্যাচে ৩৩.৪৫ গড়ে ৬৬৯ রান সংগ্রহ করেছেন।
ভারতের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজে সাকিব আল হাসান ও জাকির হাসানও শীর্ষ সাতের মধ্যে ব্যাট করবেন। তবে এ দুজনের সাম্প্রতিক চার বছরে অ্যাওয়ে গড় যথাক্রমে ২৫.৫৭ এবং ২২.৬৬, যা ৩০-এর নিচে। জাকির এখন পর্যন্ত বিদেশের মাটিতে শুধু পাকিস্তান সফরেই টেস্ট খেলেছেন।

অ্যাওয়ে ম্যাচের পারফরম্যান্স ছাড়াও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের শীর্ষ সাত ব্যাটসম্যানদের গড় গত চার বছরে বেড়েছে। ২০১৬-২০ সময়ে এই গড় ছিল ৩২.৫, যা গত চার বছরে বেড়ে ৩৪.০-এ পৌঁছেছে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের অ্যাওয়ে ব্যাটিংয়ের উন্নতি কি তাদের ভারত সফরে ভালো করতে সাহায্য করবে? ভারতের কি নিজেদের মাটিতে ব্যাটিংয়ের মান বাড়েনি? পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের মাটিতে তাদের ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স উন্নতি তো দূরের কথা, বরং গত আট বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৬-২০ সময়কালে ভারতের শীর্ষ সাত ব্যাটসম্যানের গড় ছিল ৫৪.৪৩, যা ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ৩৮.৩০-এ নেমে এসেছে—পার্থক্য ১৬.১৩। এই সময়ে কোনো দলেরই হোম গড় এতটা কমেনি, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গড় হ্রাসের হার ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার, যা ৬.২২।
আরেকটু গভীরে গেলে দেখা যাবে, ভারতের যে ব্যাটসম্যানদের নিয়ে বাংলাদেশের আতঙ্ক বেশি, তাদেরই গড় কমেছে অনেক বেশি। ২০১৬-২০ সময়ে ঘরের মাঠে খেলা ২২ টেস্টে বিরাট কোহলির গড় ছিল ৮৬.১৭, সেঞ্চুরি ছিল ১০টি। অথচ ২০২১-২৪ সময়ে ১১ টেস্ট খেলে কোহলির গড় অর্ধেকের কম—মাত্র ৩৪.৪৭, সেঞ্চুরি মাত্র ১টি। ভারত অধিনায়ক রোহিতেরও ঘরের মাঠে গড় কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। আগের চার বছরে ১০ টেস্টে ১০১.১০ গড়ে রান তুললেও গত চার বছরে খেলা ১৫ টেস্টে তা ৪৪.৮৭-এ নেমে এসেছে।

সব মিলিয়ে যা বোঝা যাচ্ছে, ফল শেষ পর্যন্ত যেমনই হোক, বাংলাদেশ দল নিজেদের ব্যাটিং এবং ভারতের কোহলি-রোহিতের হুমকির বিষয়ে কিছুটা হলেও আশাবাদী হতেই পারে।