রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ১০:৩৯ অপরাহ্ন
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) অভিযোগ করেছে যে, ইসরায়েল গাজায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করে একটি গণহত্যা চালাচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার, মার্কিন মানবাধিকার সংস্থাটি একটি নতুন প্রতিবেদনে এই অভিযোগ তুলেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, এইচআরডব্লিউ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে।
এইচআরডব্লিউ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ইসরায়েল গাজার জনগণকে জরুরি পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করতে দেয়নি, যার ফলে উপত্যকাটির হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে এবং নানা ধরনের রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গাজা উপত্যকায় পানি সরবরাহের প্রায় সব সিস্টেমই অকার্যকর হয়ে গেছে এবং সেখানে পানি পানযোগ্য নয়। এমনকি, সদ্যজাত শিশুরা মায়ের অপুষ্টির কারণে বুকের দুধ না পেয়ে দূষিত পানি খাচ্ছে।
এইচআরডব্লিউ দাবি করেছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন এবং গণহত্যা কনভেনশন এবং রোম স্ট্যাটিউট অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) লঙ্ঘন করছে। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত করে গাজাবাসীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, এবং মানবিক সহায়তা বন্ধ করা হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য পরিচালক লামা ফাকিহ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘ইসরায়েলি সরকার গাজার ফিলিস্তিনিদের পানি সরবরাহ থেকে বঞ্চিত করে ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের হত্যা করছে।’
এইচআরডব্লিউ-এর ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বিল ভ্যান এসভেল্ড বলেছেন, সংগঠনটি ১১৫ জনের বেশি সাক্ষাৎকার নিয়েছে এবং স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে তদন্ত করেছে। তারা চারটি প্রধান বিষয় উদঘাটন করেছে।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল গাজায় পানীয় পানি সরবরাহকারী পাইপলাইনগুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং পরে বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ করেছে, যা পানির পাম্প এবং রিজার্ভ চালু রাখার জন্য প্রয়োজন।’ ফলে, পানি শোধন প্ল্যান্ট, পানি কূপ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
ভ্যান এসভেল্ড আরও যোগ করেন, ‘কিছু স্থাপনায় সৌর প্যানেল ছিল, যা বিদ্যুৎ বন্ধ হলে বিকল্প শক্তি হিসেবে কাজ করত। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজার ছয়টি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টের মধ্যে চারটির সৌর প্যানেল সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এটি একটি ইচ্ছাকৃত পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা, যা একটি জনগণের বৃহৎ অংশকে হত্যা করবে।’
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, গাজার ফিলিস্তিনিরা প্রতিদিন মাত্র ২ থেকে ৯ লিটার পানি পাচ্ছে, যা ১৫ লিটারের ন্যূনতম সীমার থেকেও কম। এর ফলে রোগ ছড়াচ্ছে এবং মৃত্যুহার বাড়ছে।
এই পরিস্থিতি ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশনের আওতায় গণহত্যা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজার ফিলিস্তিনিদের ওপর এমন জীবনযাত্রার শর্ত আরোপ করেছে, যা তাদের শারীরিক ধ্বংস সাধনের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত।
ইসরায়েল বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং এইচআরডব্লিউ-এর প্রতিবেদনের ফলাফলকে মিথ্যা হিসেবে অভিহিত করেছে।
এছাড়া, জার্মানির সরকারি সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের ১৩ সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন, তাদের ওপর হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের সংবাদে ইসরায়েলের পক্ষে লেখা চাপ দেওয়া হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন, অফিসে ফিলিস্তিনিবিরোধী এবং ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড অবাধে চলছে।
অন্যদিকে, আলজাজিরার হাতে আসা একটি নথি থেকে জানা গেছে, ডয়চে ভেলের কর্মীদেরকে সংবাদ লেখার সময় ‘ফিলিস্তিনি’ শব্দটি ব্যবহার না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ, ফিলিস্তিন এখনও স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায়নি, তাই ‘ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড’ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের হামলার প্রতিউত্তরে ইসরায়েল গাজায় অভিযান শুরু করে। এই সময়ে ৪৫,০০০ এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী শান্তিপ্রক্রিয়ার জন্য নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সরকারের কাছে এই যুদ্ধ থামানোর কোনো লক্ষণ নেই। এর ফলে, অধিকাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে গাজা অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।