সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:০৪ পূর্বাহ্ন
হঠাৎ করে কর্মবিরতিতে গিয়ে সারাদেশে ট্রেন চলাচল অচল করে দিয়েছেন রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। পূর্বঘোষণা ছাড়াই সোমবার রাত ১২টার পর এই কর্মসূচি শুরু হলে মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিভিন্ন রেলস্টেশনে ট্রেন থমকে যায়। হাজার হাজার যাত্রী স্টেশনে এসে জানতে পারেন, ট্রেন ধর্মঘট চলছে। অনেকেই ভেবেছিলেন, সাময়িক জটিলতা কাটিয়ে হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে চলাচল শুরু হবে, কিন্তু সময় গড়াতেই বোঝা যায়, পরিস্থিতি আরো ঘোরালো। যাত্রীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন—গন্তব্যে কীভাবে পৌঁছাবেন? টিকিটের টাকা কীভাবে ফেরত পাবেন? অনেক যাত্রী পরিবারসহ স্টেশনে আটকে যান, কেউ কেউ ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, ময়মনসিংহ, পঞ্চগড়, রংপুর, লালমনিরহাট, যশোর, কক্সবাজারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে যাত্রীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। রাজশাহীতে বিশ্রামাগারের চেয়ার-জানালা ভাঙচুর হয়, চট্টগ্রামেও বিক্ষোভ চরমে ওঠে। এই সুযোগে দূরপাল্লার বাসগুলোর টিকিটের দাম হঠাৎ দ্বিগুণ হয়ে যায়, ফলে যাত্রীদের নতুন আরেক বিপদে পড়তে হয়। রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের বিকল্প হিসেবে বিআরটিসির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস চালু করলেও যাত্রীদের সাড়া কম ছিল। বেশির ভাগ মানুষ বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিয়েই বাসে চড়তে বাধ্য হন।
দুই ঘণ্টার বেশি আলোচনার পরও কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি রেল কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক কর্মচারী সমিতির ঢাকা বিভাগীয় সভাপতি সাঈদুর রহমান জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
এই কর্মবিরতির মূল কারণ রানিং অ্যালাউন্সসহ অন্যান্য সুবিধা পেনশনের সঙ্গে যুক্ত করা। অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২১ সালে একটি নির্দেশনায় এই সুবিধা বাতিল করে, যা রানিং স্টাফদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। এরপর থেকেই তারা বারবার দাবি জানিয়ে আসলেও সমাধান হয়নি।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম গতকাল দুপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসও। তবে এই বৈঠকেও কোনো সমাধান মেলেনি। বৈঠকের পর রানিং স্টাফরা জানিয়ে দেন, তারা কর্মবিরতি চালিয়ে যাবেন। সচিব বৈঠক শেষে বলেন, “রেলভবনে আবার আলোচনা হবে,” তবে শ্রমিক নেতারা জানিয়ে দিয়েছেন, তারা লিখিত আশ্বাস ছাড়া কর্মসূচি স্থগিত করবেন না।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “দাবি থাকতেই পারে, তবে ট্রেন বন্ধ রেখে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা অনুচিত। এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিষয়, আলোচনায় সমাধান হবে।” অন্যদিকে, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “রেলের কর্মচারীদের সুবিধা আমরা দিয়েছি। কিন্তু এখনো তারা কেন আন্দোলন করছে, তা তাদের ব্যাপার।”
রানিং স্টাফরা ট্রেনে দায়িত্ব পালন শেষে ১২ ঘণ্টা বা আট ঘণ্টার বিশ্রাম পান। তবে রেলের স্বার্থে তাদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হলে ‘মাইলেজ’ নামে একটি বিশেষ ভাতা দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর এই সুবিধা সীমিত করা হয়, যা নিয়েই মূলত ক্ষোভ দানা বাঁধে।
রেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন জানান, “যারা যাত্রা বাতিল করেছেন, তারা টিকিটের পুরো অর্থ ফেরত পাবেন।”
ময়মনসিংহে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনটি পাঁচ শতাধিক যাত্রী নিয়ে ময়মনসিংহ স্টেশনে এসে থামে। হঠাৎ করেই ট্রেনচালক নিখোঁজ হয়ে যান! হতবাক যাত্রীরা বিক্ষোভ শুরু করেন এবং স্টেশন সুপারিনটেনডেন্টকে অবরুদ্ধ করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এই অচলাবস্থা কত দিন চলবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না শিগগিরই!