সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:২৩ পূর্বাহ্ন
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়ে ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার প্রতিবাদে আহত ব্যক্তিদের শান্ত করতে বুধবার রাত আড়াইটার দিকে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) সামনের সড়কে ছুটে যান অন্তর্বর্তী সরকারের চারজন উপদেষ্টা এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার একজন সহকারী। তাঁদের দাবি পূরণের আশ্বাসে প্রায় সাড়ে ১৩ ঘণ্টা পর আহতরা সড়ক থেকে ফিরে হাসপাতালে যেতে সম্মত হন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত পঙ্গু হাসপাতাল ও কাছের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি বুধবার দুপুর ১টা থেকে হাসপাতালের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। আহতদের মধ্যে কারও এক পা নেই, কেউ হুইলচেয়ারে, আবার কেউ চোখে ব্যান্ডেজ পরে ছিলেন। এক পর্যায়ে তাঁরা স্বাস্থ্য উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে তাঁরা হাসপাতালের ভেতরে ফিরে যাওয়ার শর্ত হিসেবে চারজন উপদেষ্টার উপস্থিতি দাবি করেন।
উপদেষ্টারা না পৌঁছানোয় রাত ১২টার পর আহত ব্যক্তিরা হাসপাতাল থেকে বিছানাপত্র এনে সড়কে অবস্থান চালিয়ে যান। কেউ শুয়ে, কেউ বসে সময় পার করতে থাকেন। এ সময় রাত আড়াইটার দিকে সেখানে উপস্থিত হন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী মো. সায়েদুর রহমান।
উপদেষ্টারা ভুল স্বীকার করে দুঃখপ্রকাশ করেন। তাঁরা আহতদের দাবি নিয়ে আলোচনা করতে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় সচিবালয়ে বৈঠক আয়োজনের কথা বলেন। আহতদের প্রতিনিধি দলের জন্য দুটি গাড়ি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁরা আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য একটি রূপরেখা তৈরি করে ডিসেম্বরের মধ্যে তা বাস্তবায়নের ঘোষণাও দেন।
প্রথমে উপদেষ্টা মাহফুজ আলম আহতদের উদ্দেশে বলেন, ‘এখন এখানে আপনাদের কথা শোনার উপযুক্ত সময় নয়। আপনারা কাল দুপুর ২টায় সচিবালয়ে আসুন। আলোচনা করে একটি রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে, যা ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে।’ তিনি সুষ্ঠু ব্যবস্থা না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘আপনাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হবে।’
এরপর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমাদের ব্যর্থতা এবং ভুল আছে। তবে আমাদের চেষ্টা কম ছিল না। যেকোনো কারণেই হোক আমরা পারিনি। আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন, আমরা লিখিত আকারে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেব।’
নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘একটি ভঙ্গুর অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। অনেক সমস্যা সামনে এসেছে। আসুন আমরা আলোচনার মাধ্যমে একটি রূপরেখা তৈরি করি। এর বাস্তবায়ন সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য আপনারা একটি টিম তৈরি করবেন।’
স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী মো. সায়েদুর রহমান প্রতিশ্রুতি দেন যে, আহতদের দেশের সেরা চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটা সুযোগ দিন। ব্যত্যয় ঘটলে আমরা আর দায়িত্বে থাকব না।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আপনাদের সমস্যাগুলোর সমাধান করব। না পারলে তখন আপনারা যা ইচ্ছা করবেন, তাতে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। তবে আমরা আপনাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করব।’
এরপর আহতরা হাসপাতালে ফিরে যেতে সম্মত হন। উপদেষ্টারা তাঁদের নিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করেন। আহতদের শয্যায় পৌঁছে দিয়ে উপদেষ্টারা রাত সোয়া ৪টার দিকে হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
গত জুলাই-আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় আহত হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষোভ–বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের পঙ্গু হাসপাতাল পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের দেখতে সকালে তিনি পঙ্গু হাসপাতালে যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সকলের সঙ্গে দেখা করেননি—এই অভিযোগে হাসপাতাল ত্যাগের সময় আহত ব্যক্তিরা তাঁর পথ রোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে তাঁরা রাস্তায় নেমে আসেন।
প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বেলা ১১টার দিকে পঙ্গু হাসপাতালে আসেন। তৃতীয় ও চতুর্থ তলার ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আহতরা আন্দোলনের সময় আহত হয়েছিলেন। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা চতুর্থ তলায় কয়েকজনের খোঁজ নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টার আগমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে আহতরা গাড়ির পথ আটকে দাঁড়ান। কেউ গাড়ির সামনে শুয়ে পড়েন। দু-একজন গাড়ির ওপর উঠে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এ সময় উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম অন্য গাড়িতে করে চলে যান। ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুককেও আলাদা গাড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়। পুলিশ সদস্যরা আহতদের থামাতে ব্যর্থ হন।
উপদেষ্টা চলে যাওয়ার পর আহতরা আগারগাঁও-শ্যামলী সড়কে অবস্থান নেন। এ সময় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট থেকে আহতরা যোগ দেন। এতে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে সেনাসদস্যরা পৌঁছে আহতদের হাসপাতালে ফেরার অনুরোধ করেন, কিন্তু তাঁরা ফেরেননি।
বেলা দুইটার দিকে আহতদের পক্ষ থেকে মো. মাসুম হুইলচেয়ারে বসে জানান, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা চতুর্থ তলায় গেলেও তিনতলায় থাকা আহতদের দেখতে আসেননি। তিনি বলেন, ‘তাঁরা আমাদের রক্তের বিনিময়ে দায়িত্বে রয়েছেন।’ মাসুম আরও জানান, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের এক লাখ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি।
চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট থেকে রাস্তা অবরোধে আসা আল মিরাজ নামের একজন আহত শিক্ষার্থী জানান, গুলিতে তাঁর ডান চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশে চিকিৎসা সম্ভব নয়, তাই বিদেশে চিকিৎসার দাবি জানান তিনি। আল মিরাজ বলেন, ‘স্বাস্থ্য উপদেষ্টা পঙ্গু হাসপাতালের আহতদের দেখলেও চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীনদের দেখেননি।’
আহত ব্যক্তিদের সড়কে অবস্থানের সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক সেনা ও পুলিশ উপস্থিত ছিলেন। রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ থাকে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এসে না দেখা দেওয়া পর্যন্ত তাঁরা সড়ক ছাড়বেন না। পরে চারজন উপদেষ্টার উপস্থিতির দাবি ওঠে।
সন্ধ্যার পর প্রথমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ উপস্থিত হন। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আন্দোলনে নিহত মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ আহতদের সঙ্গে কথা বলেন। তবে তাঁদের অনুরোধে আহতরা সড়ক ছাড়েননি।
রাত ১২টার আগে হাসনাত আবদুল্লাহ আবার আসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা দুই ব্যক্তির সঙ্গে আহতদের ধাক্কাধাক্কি হয়। তবে অল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যায়।