বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৩ অপরাহ্ন
এনবিআর নেই, এবার আসছে কর ব্যবস্থার নতুন রূপ!
অনলাইন ডেস্ক
সরকার ব্যাখ্যা দিয়েছে কেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এই ব্যাখ্যা উঠে আসে।
পোস্টে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি বৈপ্লবিক কাঠামোগত সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে।
এই সংস্কারের আওতায় এনবিআর বিলুপ্ত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি স্বতন্ত্র সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে—রেভিনিউ পলিসি ডিভিশন (রাজস্ব নীতিমালা বিভাগ) এবং রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন (রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ)।
মূল লক্ষ্য হলো কর নীতিনির্ধারণ ও কর প্রশাসনের কাজ আলাদা করে এনে দক্ষতা বাড়ানো, স্বার্থের দ্বন্দ্ব কমানো এবং রাজস্ব আহরণের পরিধি প্রসারিত করা।
প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে গঠিত এনবিআর ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ। বর্তমানে দেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত ৭.৪ শতাংশ, যা পুরো এশিয়ায় অন্যতম নিম্নতম।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক গড় হলো ১৬.৬ শতাংশ, আর মালয়েশিয়ার মতো দেশের অনুপাত ১১.৬ শতাংশ। সরকারের মতে, দেশের জনগণের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতে হলে ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত অন্তত ১০ শতাংশে নিতে হবে।
এনবিআরের কাঠামোগত রূপান্তর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অপরিহার্য। দিন দিন মত তৈরি হচ্ছে যে একটি একক প্রতিষ্ঠানের হাতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকা মানেই স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও অদক্ষতার জন্ম।
বছরের পর বছর ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছেন—কর নীতিতে রাজস্ব আহরণই প্রধান বিবেচনা, ফলে ন্যায্যতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা উপেক্ষিত থেকেছে।
এনবিআরের দীর্ঘদিনের নানা জটিলতা:
স্বার্থের দ্বন্দ্ব: একই ছাতার নিচে নীতি ও বাস্তবায়নের দ্বায়িত্ব থাকায় কর ব্যবস্থায় দুর্বলতা, অনিয়ম এবং অনিয়ন্ত্রিত সমঝোতা বেড়েছে। অনেক সময় কর কর্মকর্তারা জবাবদিহির বাইরে থেকে ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে ফাঁকিদাতাদের রক্ষা করেন।
নিরুৎসাহিত প্রশাসন: আদায়কারী কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের কোনো কার্যকর পদ্ধতি নেই। পদোন্নতি ও স্বীকৃতিতে নেই কর্মক্ষমতার ভিত্তি।
দুর্বল রাজস্ব আহরণ: নীতি প্রণয়ন যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ ততটাই উপেক্ষিত থেকেছে। ফলে করজাল সংকীর্ণ এবং রাজস্ব আহরণ সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
শাসনঘাটতি: এনবিআর কার্যকর আইন প্রয়োগে ব্যর্থ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে দুর্বল এবং প্রশাসনিক অনিয়মে জর্জরিত, যার প্রভাব পড়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে।
জটিল আমলাতন্ত্র: অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রধান একইসাথে এনবিআরের প্রধান হওয়ায় নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এর জেরে কর ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে জটিলতা।
ভিতরে ভিতরে ক্ষোভ: অভিজ্ঞ কর ও শুল্ক কর্মকর্তাদের অনেকেই এই সংস্কারকে অবমূল্যায়ন হিসেবে দেখছেন, যার ফলে দপ্তরের ভেতরে চাপে পড়েছে কর্মপরিবেশ।
তবে এই রূপান্তরের মাধ্যমে যেসব উপকার মিলবে, তা-ও ব্যাখ্যা দিয়েছে সরকার—
দায়িত্বে সুনির্দিষ্টতা: রেভিনিউ পলিসি ডিভিশন নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক চুক্তি দেখবে, আর ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন কর আদায়, নিরীক্ষা ও অনুগততা নিশ্চিত করবে। এতে নীতি প্রণয়নকারীরা আদায় থেকে আলাদা থাকায় স্বার্থের সংঘাত ও দুর্নীতির সম্ভাবনা কমবে।
দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়বে: প্রতিটি বিভাগ নিজ নিজ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করবে। ফলে পেশাদারিত্ব বাড়বে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
করজাল ও প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধি: পুনর্গঠন হলে করের আওতা বাড়বে, পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সঠিক পেশাজীবীদের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ কর আহরণ হবে কার্যকর।
ভবিষ্যতমুখী নীতিমালা: আলাদা নীতি ইউনিট তথ্যনির্ভর ও উন্নয়নমুখী কৌশল প্রণয়নে সক্ষম হবে, যা শুধু তাৎক্ষণিক রাজস্ব লক্ষ্যে সীমিত থাকবে না।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা: সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা এবং পেশাদার প্রশাসন বেসরকারি খাতের আস্থা বাড়াবে, বিনিয়োগে গতি আসবে।
সব মিলিয়ে, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক রদবদল নয়—বরং বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় এক গভীর, ন্যায্য ও দক্ষ সংস্কার। শক্তিশালী নীতিনির্ধারণী কাঠামো ও স্বচ্ছ প্রশাসনই ভবিষ্যতের উন্নয়ন ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে গণমাধ্যম।