শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১২ পূর্বাহ্ন
সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫ জন ঢাকার এবং ৩ জন খুলনা বিভাগের। ফলে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১৭৪ জনে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ১৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
বুধবার (২ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুসারে এ খবর জানা গেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৭ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯১ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ৬২৬ জন।
অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বছরের প্রথম ৯ মাসে ডেঙ্গুতে ১৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে শুধুমাত্র সেপ্টেম্বরে মৃত্যু হয়েছে ৯১ জনের। আগের আট মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৮৩ জনের। এই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ৩৩ হাজার ৯৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
এর মধ্যে শুধুমাত্র সেপ্টেম্বর মাসেই ২২ হাজার ২৫৮ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর এই উর্ধ্বমুখী প্রবণতার পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে অতিবৃষ্টির কারণে ডেঙ্গু ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ের অভাব প্রধান সমস্যার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, গত এক দশকে (২০১৪-২০২৩) পাঁচবার সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর পিক সিজন হয়েছে। এছাড়া অক্টোবরে তিনবার, নভেম্বরে এবং আগস্টে একবার করে পিক সিজন হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল হক বলেন, অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। অতিবৃষ্টির কারণে অনুকূল পরিবেশ থাকায় এডিস মশার সংখ্যা বেড়েছে।
তিনি আরও জানান, ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত হটস্পট ব্যবস্থাপনা জরুরি। এর জন্য সঠিক রোগী ও মশার জরিপের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সঠিকভাবে কোনো কাজ করা হয়নি। এখন জনসাধারণকেও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের উদ্যোগে সরাসরি অংশ নিতে হবে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ১ হাজার ৫৫ জন, যাদের মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে ৩৩৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল এবং মৃত্যু হয়েছিল ৩ জনের। মার্চ মাসে ৩১১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় এবং ৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এপ্রিল মাসে ৫০৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং ২ জনের মৃত্যু হয়। মে মাসে ৬৪৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এবং মৃত্যু হয়েছিল ১২ জনের। জুনে ৭৯৮ জন ভর্তি হয় এবং মৃত্যু হয়েছিল ৮ জনের। জুলাই মাসে ২ হাজার ৬৬৯ জন ভর্তি হয়েছিল এবং মৃত্যু হয়েছিল ১২ জনের। আগস্টে ৬ হাজার ৫২১ জন ভর্তি হয়েছিল এবং মৃত্যু হয়েছিল ২৭ জনের।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বৃষ্টি ও আর্দ্রতার কারণে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া গত দুই মাস ধরে সিটি করপোরেশনের মেয়র, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং পৌরসভার কাউন্সিলর না থাকায় মশা নিধন কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল। এখনও কিছু এলাকায় এই কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশনগুলোকে এখন এডিস মশা নিধনে দ্রুত সক্রিয় হতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবা উন্নত করতে হবে। শুধুমাত্র হাসপাতালের ওপর নির্ভর না করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে। সেখানে ৭ হাজার ৪৮৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপরে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে ৬ হাজার ৯১২ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৬ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত এবং ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশে প্রথমবারের মতো ২০০০ সালে ডেঙ্গুর বড় আকারের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এরপর থেকে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল গত বছর। সে বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত হয়েছিল এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এর আগে, ২০১৯ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রথমবারের মতো এক লাখ ছাড়ায়। ওই বছর ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ভর্তি হয়েছিল এবং ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল।