শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ন
খুনিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিচার চেয়ে পথে সাধারণ মানুষ!
বেবিয়ারা খাতুন, স্টাফ রিপোটার চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় ফের রক্তাক্ত ঘটনার সাক্ষী হলো জনতা। ৩২ বছর বয়সী গোলাম আজমকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রমজানের ১৮ তারিখে (১৯ মার্চ) বিকেলে, যখন সে ইফতারি কিনে বাড়ি ফিরছিল। দিনের আলোয় জনসম্মুখে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দেয়। স্থানীয়ভাবে কুখ্যাত একদল সন্ত্রাসী — মো. আলমগীর, ঊাবু, আওয়াল, শেরাফাত সহ আরও কয়েকজন — তার ওপর দেশীয় অস্ত্র দিয়ে অতর্কিত হামলা চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে বলে অভিযোগ করেন প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের পরিবার।
ঘটনার পরপরই নিহতের পরিবার শিবগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে, যাতে নামীয় ১৬ জন ও অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করা হয়। তবে মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমনকি নিহত গোলাম আজমের পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি দিয়ে চলেছে বলে অভিযোগ তাদের। এ ঘটনায় এলাকার সাধারণ মানুষ চরম হতাশা, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের প্রকাশ্যে চলাফেরা গোটা সমাজব্যবস্থার ওপর প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, ১১ মে শনিবার সকালে শিবগঞ্জ মডেল সরকারি হাইস্কুলের সামনে এলাকাবাসী এবং ভুক্তভোগী পরিবার মানববন্ধনের আয়োজন করে। ঘণ্টাব্যাপী চলা মানববন্ধনে নিহতের বাবা আব্দুল খালেক, মা রহিসা বেগম, স্ত্রী হালেমা খাতুন, বোন খালেদা বেগমসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। তারা দোষীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন ও সংস্কার সংস্থার জেলা সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন মেহেদী, শিবগঞ্জ পৌর শাখার সভাপতি এস এম মহিউদ্দিন এবং রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসলাম উদ্-দৌলা।
বক্তারা বলেন, যাদের বিরুদ্ধে হত্যা অভিযোগ রয়েছে, তারা বহুদিন ধরে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে। তাদের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক অপরাধের অভিযোগ ছিল, কিন্তু শক্তিশালী প্রভাব ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে তারা বারবার আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে গেছে। এবার যদি কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও বেগবান হবে।
বক্তারা প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যদি আসামিদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় না আনা হয়, তাহলে এলাকাবাসী আরও কঠোর কর্মসূচির ডাক দিতে বাধ্য হবে। তাদের দাবি, এ ধরনের অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হলে জনরোষ সামলানো কঠিন হবে।
শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম কিবরিয়া জানান, “গোলাম আজম হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তথ্য সংগ্রহ ও গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। শিগগিরই অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে।” তবে ওসির এই বক্তব্যে এলাকাবাসীর আস্থা নেই। তাদের প্রশ্ন—দুই মাস ধরে তথ্য সংগ্রহ চলছে, কিন্তু একটি গ্রেপ্তারও হয়নি কেন?
এই ঘটনা শুধু একটি হত্যার অভিযোগ নয়, বরং এর মধ্যে নিহিত রয়েছে বিচারহীনতা, সন্ত্রাসের লাগামহীন বিস্তার এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতার প্রশ্ন। শিবগঞ্জের এই হত্যাকাণ্ড এখন পুরো জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। সাধারণ মানুষ চায়, গোলাম আজম হত্যার বিচার যেন আর কোনোভাবেই বিলম্বিত না হয়—কারণ ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে, তা কার্যত ন্যায়বিচার অস্বীকৃতিরই সমতুল।