বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন
ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী Asha Bhosle-এর প্রয়াণে মুম্বাইয়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
মুম্বাই, ১২ এপ্রিল ২০২৬: ভারতীয় সঙ্গীত ভুবন হারাল তার উজ্জ্বলতম এক নক্ষত্রকে। কিংবদন্তি প্লেব্যাক কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে শনিবার গভীর রাতে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তাঁর চলে যাওয়ার খবরে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে সমগ্র উপমহাদেশ। দীর্ঘ আট দশক ধরে যে কণ্ঠ কোটি মানুষের হৃদয়ে অনুরণন তুলেছে, আজ সেই সুর চিরতরে থেমে গেল।
জন্ম ও পরিবার: সুরের আবহে শৈশব
আশা ভোঁসলের জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে। জন্মনাম ছিল আশা মঙ্গেশকর। তাঁর পিতা ছিলেন প্রখ্যাত নাট্যশিল্পী ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত Deenanath Mangeshkar। মা শেবন্তী মঙ্গেশকর ছিলেন গৃহিণী, তবে পরিবারজুড়ে ছিল সঙ্গীতের আবহ। দীননাথ মঙ্গেশকর মারাঠি থিয়েটারের কিংবদন্তি এবং গোয়ালিয়র ঘরানার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই মঙ্গেশকর পরিবারের সন্তানদের সঙ্গীতে হাতেখড়ি।
পিতার অকাল মৃত্যুর পর মাত্র ৯ বছর বয়সেই আশা পিতৃহারা হন। এরপর বড় বোন Lata Mangeshkar-এর সঙ্গে সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেন।
সঙ্গীতের পরিবার: মঙ্গেশকর বংশ
মঙ্গেশকর পরিবার ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে।
এই পরিবার থেকে ভারত পেয়েছে শাস্ত্রীয় থেকে আধুনিক—সব ধরনের সঙ্গীতের দিকপাল।
সঙ্গীত জীবন: হাজারো গানের সম্রাজ্ঞী
১৯৪৩ সালে মারাঠি চলচ্চিত্র ‘মাঝা বাল’-এ মাত্র ১০ বছর বয়সে প্লেব্যাক শুরু করেন তিনি। হিন্দি গানে আত্মপ্রকাশ ১৯৪৮ সালে ‘চুনরিয়া’ ছবির মাধ্যমে।
৫০-এর দশকে O. P. Nayyar-এর সুরে ‘মাঙ্গ কে সাথ তুমহারা’, ‘আইয়ে মেহেরবান’, ‘ইয়ে হ্যায় বম্বে মেরি জান’ গানগুলো তাঁকে এনে দেয় ‘ক্যাবারে কুইন’-এর খ্যাতি। পরবর্তীতে ৭০ ও ৮০-এর দশকে স্বামী Rahul Dev Burman-এর সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি উপহার দেন ‘দম মারো দম’, ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘মেরা কুছ সামান’-এর মতো অমর সৃষ্টি।
গজল, কাওয়ালি, পপ, লোকগান ও ডিস্কো—২০টিরও বেশি ভাষায় ১২ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বয় জর্জ, বয়জোন এবং মাইকেল স্টাইপের সঙ্গে কাজ করেছেন। এমনকি ২০২৩ সালে ৯০ বছর বয়সেও দুবাইয়ে লাইভ কনসার্টে মুগ্ধ করেছেন দর্শকদের।
পুরস্কার ও সম্মাননা: অর্জনের দীর্ঘ তালিকা
১. দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার: ২০০০ সালে
২. পদ্মবিভূষণ: ২০০৮ সালে
৩. জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: দুইবার শ্রেষ্ঠ নারী প্লেব্যাক গায়িকা
৪. ফিল্মফেয়ার পুরস্কার: ৭ বার জয়ী, ১৮ বার মনোনয়ন
৫. গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড: ২০১১ সালে সর্বাধিক গান রেকর্ডের স্বীকৃতি
৬. গ্র্যামি মনোনয়ন: ২ বার
শেষ বিদায় ও শোক
ছেলে আনন্দ ভোঁসলে জানিয়েছেন, রবিবার সকালে লোয়ার প্যারেলের কাসা গ্র্যান্ডেতে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করা যাবে। শেষকৃত্য বিকেল ৪টায় শিবাজী পার্কে অনুষ্ঠিত হবে।
প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে।
উল্লেখযোগ্য শোকবার্তা
শিল্পী অমর
আশা ভোঁসলে শুধুই একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। লতা মঙ্গেশকরের ছায়া অতিক্রম করে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করা, পুরুষপ্রধান ইন্ডাস্ট্রিতে সাহসী সঙ্গীত উপস্থাপন, এমনকি নব্বই বছর বয়সেও মঞ্চে সমান সক্রিয় থাকা—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী।
‘পিয়া তু’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া’, ‘দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়’—এই গানগুলো যতদিন বাজবে, ততদিন তাঁর স্মৃতি বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।
কারণ কিছু কণ্ঠ কখনও হারিয়ে যায় না। তারা সময়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকে। আশা ভোঁসলে তেমনই এক নাম—একটি যুগ, একটি অনুভূতি।
বিদায় সুরসম্রাজ্ঞী। আপনার ‘মেরা কুছ সামান’ ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। শুধু শ্রদ্ধা আর অশ্রুতেই জানাই—আপনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন।