শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪২ অপরাহ্ন
রমজানের বরকতময় খাবার সাহরি
সাহরি হলো রাতের শেষ প্রহরে গ্রহণ করা খাবার, যা রোজা পালনের প্রস্তুতি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ তাআলা রোজার উদ্দেশ্যে ভোরের আগে সাহরি খাওয়ার বিধান দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহরি খেতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং এটিকে বরকতময় বলে উল্লেখ করেছেন। সাহরি মুসলিম উম্মাহর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা তাদের রোজাকে অন্যদের থেকে পৃথক করে।
সাহরি মূলত ফজরের আগে শেষ রাতের সময়ের খাবার। আল্লামা যামাখশারী (রহ.) বলেন, রাতকে ছয় ভাগ করলে তার শেষ ভাগই সাহরির সময়। মোল্লা আলি কারি (রাহ.) উল্লেখ করেন, রাতের অর্ধেক অতিক্রম করার পর থেকেই সাহরির সময় শুরু হয় এবং ফজরের পূর্ব পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে (মিরকাতুর মাফাতিহ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪১৬)। যদিও শুরুর সময় নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে, তবে সমাপ্তি সম্পর্কে সবাই একমত—সুবহে সাদিক শুরু হলেই সাহরির সময় শেষ।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা খাও ও পান করো যতক্ষণ রাতের কালো রেখা হতে উষার সাদা রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের কাছে প্রতিভাত না হয়। অতঃপর রাত আগমন পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭) সুতরাং সুবহে সাদিক শুরু হওয়ার পর পানাহার করলে রোজা ভঙ্গ হবে—এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
সাহরির রয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও বরকত। আনাস ইবন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮২৩; মুসলিম, হাদিস : ২৬০৩)
আমর ইবন আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমাদের ও কিতাবধারীদের (ইহুদি-খ্রিষ্টান) রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো, সাহরি খাওয়া।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬০৪)
ইবন উমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা সাহরি গ্রহণকারীদের জন্য রহমতের দোয়া করেন।’ (ইবন হিব্বান, হাদিস : ৩৪৬৭)
সাহরি বরকতময় হলেও অতিরিক্ত আহার করা আবশ্যক নয়। সামান্য পানি পান করলেও সাহরির সুন্নত আদায় হয়ে যায় (ইবন হিব্বান, হাদিস : ৩৪৭৬)। খেজুর দিয়ে সাহরি করা উত্তম। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিনের উত্তম সাহরি হলো- খেজুর।’ (আবু দাউদ : ২৩৪৭)
অতএব অল্প খাবার হলেও নিয়তের সাথে সাহরি গ্রহণই মূল বিষয়।
সাহরির সময় দেরি করে শেষ প্রহরে খাওয়াই সুন্নত। যায়দ ইবন সাবেত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাহরি করেছি, এরপর ফজরের নামাজ আদায় করেছি। জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, সাহরি ও নামাজের মাঝখানে ৫০ আয়াত তেলাওয়াতের পরিমাণ সময় ছিল (বুখারি : ১৮২১; মুসলিম : ২৬০৬)।
আমর ইবন মায়মুন আল-আওদী (রা.) বলেন, সাহাবায়ে কেরাম ইফতার করতেন দ্রুত এবং সাহরি করতেন দেরিতে (আল-মুসান্নাফ : ৯০২৫; মুসান্নাফু আব্দির রায্যাক : ৭৫৯১)।
ফজরের পূর্বমুহূর্তে সাহরি করলে রোজা রাখা সহজ হয় এবং নামাজের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষাও করতে হয় না। অযথা অনেক আগে সাহরি শেষ করা সুন্নতের পরিপন্থী।
সাহরির সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পানাহার বন্ধ করতে হবে। আজান দেওয়া বা না দেওয়া সময়ের নির্ধারক নয়; বরং মূল বিষয় হলো সুবহে সাদিকের সূচনা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে দুইবার আজান হতো—প্রথমটি তাহাজ্জুদ ও সাহরির সময় জাগ্রত করার জন্য, দ্বিতীয়টি ফজরের সময়।
বেলাল (রা.) রাতের শেষভাগে আজান দিতেন। আর অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উম্মি মাকতুম (রা.) ফজরের সময় আজান দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বেলাল রাতে আজান দেয়। তোমরা খাও ও পান করো যতক্ষণ না ইবন উম্মে মাকতুমের আজান শুনতে পাও।’ (বুখারি : ২৫১৩; মুসলিম : ২৫৮৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহরি ও ফজরের নামাজের মাঝে প্রায় ৫০ আয়াত তেলাওয়াতের সমপরিমাণ সময় থাকত। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিটে ৫০ আয়াত তেলাওয়াত করা যায়। ফলে শেষ সময়ে সাহরি শেষ করে ফজরের আজানের পর কিছু সময় বিরতি দিয়ে নামাজ আদায় করলে সুন্নত পূর্ণভাবে পালন হয়।