শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৬:০০ পূর্বাহ্ন
এক বছর পর আবারও মুসলিম উম্মাহর দ্বারে উপস্থিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আকাশে দেখা মিলেছে সেই কাঙ্ক্ষিত চাঁদের, যা ঘোষণা দিয়েছে—‘এলো আনন্দের ঈদ’। রোজার পুরো মাসজুড়ে সংযম, ধৈর্য এবং আত্মশুদ্ধির যে শিক্ষা অর্জিত হয়, তারই পরিণতি এই ঈদ। তাই ঈদের প্রকৃত আনন্দ কেবল নতুন পোশাক কিংবা মুখরোচক খাবারে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং সম্প্রীতির বহিঃপ্রকাশ।
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই উচ্ছ্বাস। মুসলমানদের জন্য এটি সর্ববৃহৎ উৎসবের দিন। আজ শনিবার সেই আনন্দঘন পরিবেশে সারা দেশের মানুষ মেতে উঠবে ঈদের উৎসবে।
এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ঈদের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার খবরের পরপরই রেডিও ও টেলিভিশনে ভেসে উঠেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ…।’
ইসলামের বিধান অনুযায়ী হিজরি বর্ষপঞ্জির চান্দ্র মাসের হিসাবেই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। ২৯ রমজান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদের ঘোষণা আসে।
অন্যদিকে, শুক্রবার সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কিছু অঞ্চলে ইতোমধ্যেই ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশের কয়েকটি জেলাতেও একদিন আগে ঈদ উদযাপন করেছেন মুসল্লিরা। তারা সৌদি আরবের সময় অনুযায়ী রোজাও পালন করেন।
হাদিসে উল্লেখ আছে, মহানবী (সা.) বলেছেন—প্রত্যেক জাতির জন্য নির্দিষ্ট উৎসব রয়েছে, আর মুসলমানদের উৎসব হলো ঈদ।
ঈদুল ফিতরে ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ ভঙ্গ করা। অর্থাৎ, রোজা ভাঙার আনন্দই হলো ঈদুল ফিতর। এক মাস ধরে তারাবির নামাজ, সাহরি, ইফতার, জাকাত-ফিতরা এবং বিভিন্ন ইবাদতের মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করার পর মুসলিম উম্মাহ মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পুরস্কারস্বরূপ এই ঈদ লাভ করে। এই আনন্দ কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও উদযাপিত হয়।
ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলো জাতীয় পতাকা ও ‘ঈদ মোবারক’ খচিত ব্যানার দিয়ে সাজানো হয়েছে।
ঈদের দিনে হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশুসদন, ভবঘুরে কেন্দ্র ও এতিমখানাগুলোতে উন্নতমানের খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ইতোমধ্যেই কয়েক দিনের বিশেষ আয়োজন করেছে। ঈদকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ সংখ্যা ও ম্যাগাজিন।
ঈদকে সামনে রেখে বাজারগুলোতে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত মানুষ। নতুন পোশাকের গন্ধ, আতরের সুবাস, সেমাই ও চিনির হিসাব—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। দর্জিদের দোকানে চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা, আর শিশুদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে আনন্দের উজ্জ্বল ঝিলিক—‘ঈদ’।
ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি পরিবার সাধ্যমতো ভালো খাবার প্রস্তুত করার চেষ্টা করে। শিশুরা নতুন পোশাক পরে আনন্দে মেতে ওঠে, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যায়। ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল-অজু শেষে সেমাই ও মিষ্টি খেয়ে মুসল্লিরা ঈদের জামাতে অংশ নিতে বের হন। নামাজ শেষে ঈদগাহে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। এরপর প্রিয়জনদের কবর জিয়ারত করে তাদের আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করেন। বাড়ি ফিরে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
এক মাসের সংযম, ধৈর্য ও আত্মশুদ্ধির পর আগত এই ঈদ তাই শুধুমাত্র আনন্দের উৎসব নয়; এটি ভালোবাসা, ক্ষমা এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার প্রতীক।