বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ন
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকার জেলা প্রশাসক, দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে এ আদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার এই নির্দেশনা আসে। এর পেছনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্মান্তিক একটি ঘটনা ভূমিকা রেখেছে। ক্যাম্পাসে ব্যাটারিচালিত রিকশার ধাক্কায় প্রাণ হারান আফসানা করিম রাচি নামে এক শিক্ষার্থী। তার সম্ভাবনাময় জীবনের প্রদীপ নিভিয়ে দেয় এই যন্ত্রদানব। ক্যাম্পাসের মতো নিরাপদ স্থানে একটি রিকশা কেড়ে নেয় এক পরিবারের একমাত্র আশ্রয়। এমন ঘটনা শুধু রাচির পরিবারে নয়; সারা দেশে অসংখ্য পরিবার এমন দুঃখজনক ঘটনার শিকার হচ্ছে।
দুর্ঘটনার শীর্ষে তিন চাকার যানবাহন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল, আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তিন চাকার যানবাহন। এসব তিন চাকার যানবাহনের বড় অংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫,৫৯৮ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহীর সংখ্যা ১,৯২৪ জন। এদিকে, তিন চাকার সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইকের দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১,০৯৭ জন।
সরকারিভাবে বৈধ যানবাহনের সংখ্যা ৬২ লাখ হলেও, অবৈধ তিন চাকার যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। এগুলো পরিচালনায় কোনো প্রশিক্ষণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। এর ফলে যেকেউ যখন খুশি চালনা করতে পারে।
ব্যাটারি রিকশার অবৈধতা ও বাস্তবতা সরকারি নথি অনুযায়ী ২০১০ সাল নাগাদ অবৈধ তিন চাকার গাড়ির সংখ্যা ছিল ১০ লাখ। বর্তমানে তা ছাড়িয়ে গেছে ৬০ লাখ। ঢাকায় এখন প্রায় ২০ লাখ ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে। এর বেশির ভাগ এসেছে ঢাকার বাইরে থেকে। যানবাহনের চাহিদা পূরণে গণপরিবহন কম থাকায় ব্যাটারি রিকশার ব্যবহার বেড়েছে। তবে এগুলোই সড়ক দুর্ঘটনা এবং যানজটের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনীতির ছত্রচ্ছায়া ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়ার পেছনে রাজনৈতিক মদত রয়েছে। হাসিনা সরকারের সময় চাঁদাবাজ নেতাদের সহযোগিতায় এসব রিকশা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রিকশা চালকরা অভিযোগ করেন, স্থানীয় নেতাদের মাসিক চাঁদা দিয়ে তারা এই যান চালানোর অনুমতি পান। নেতাদের কথায় রিকশা চালকরা বিভিন্ন অবরোধ ও প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছে।
ব্যাটারি রিকশার ব্যবসা ও আমদানি চক্র দেশে ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইকের খুচরা যন্ত্রাংশ চীন থেকে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আনা হয়। সাইকেল ও মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানিকৃত এসব খুচরা অংশ ব্যবহার করে গ্যারেজে তৈরি হয় ব্যাটারি রিকশা। শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম এবং কমলাপুর এলাকায় এই যন্ত্রাংশের প্রধান বাজার। প্রায় ১০০ জন আমদানিকারক এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বনশ্রী, শ্যামপুর ও জুরাইনের মতো এলাকায় রয়েছে এসব রিকশার কারখানা।
ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ ঢাকা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন বলেন, অবৈধ যানের দাপট কমাতে আমদানি চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। গ্যারেজ ও কারখানাগুলিতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ যান জব্দ করা উচিত। একইসঙ্গে ঢাকার বাইরে থেকে আসা রিকশাগুলিকে বিতাড়িত করা প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগের দ্বৈত ভূমিকা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একাধিকবার নিষিদ্ধ হলেও পরে দলীয় নেতাদের কারণে এসব যান বৈধতা পেয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সভায় ঢাকায় ব্যাটারি রিকশা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা বাতিল করা হয়।
নিরাপদ সড়কের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ব্যাটারি রিকশার নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা এই সমস্যার সমাধান সহজ নয়। এজন্য দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর পরিকল্পনার প্রয়োজন।
সূত্র: ইনকিলাব