বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০২:০৭ পূর্বাহ্ন
ঋণ নিয়েই লাপাত্তা! বিলুপ্ত হতে পারে ১৫ প্রতিষ্ঠান
অনলাইন ডেস্ক
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে খেলাপি ঋণ ভয়াবহভাবে বেড়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এতে খাতটিতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ১৮৯ কোটি টাকায়, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩৫.৩১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ করা প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনবিএফআই খাত তারল্য সংকটে ধুঁকছে। ব্যাংকের সঙ্গে হারে-হারে প্রতিযোগিতা, পাশাপাশি অব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার অভাবের কারণে এ খাত আমানত সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের মার্চ শেষে এনবিএফআই খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ৭৬ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। যেখানে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এটি ছিল ৭৫ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। তিন মাসে ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গত বছরের মার্চে এই পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতকে ধসিয়ে দেওয়া অন্যতম ভয়াবহ কেলেঙ্কারির নাম প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার। হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে দেশ ছাড়েন তিনি। আজও পুরো অর্থ উদ্ধার হয়নি, এবং এই ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পুরো খাত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খেলাপি রোধে ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, আইনি পদক্ষেপ জোরদার এবং দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, “সব এনবিএফআই দুর্বল নয়, কিছু ভালো কাজ করছে। তবে ৩৫ শতাংশের বেশি খেলাপি খুবই চিন্তার বিষয়। খাত পুনর্গঠন জরুরি।”
তিনি বলেন, ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্ট এবং প্রম্পট কারেকটিভ অ্যাকশন (পিসিএ) এনবিএফআইতেও চালু করা দরকার।
অন্যদিকে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমরা ১৫-১৬টি এনবিএফআই চিহ্নিত করেছি, যাদের ৯৯% ঋণই খেলাপি। তাদের থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না।
তিনি আরও বলেন, তাদের লিকুইডেশন বা অন্য ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। ডিপোজিটরদের ক্ষতি কমাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে, যদিও সরকারের আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।
তাঁর মতে, দেশে ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন নেই। ২০টি প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও যথেষ্ট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, সবচেয়ে বিপর্যস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে: পিপলস লিজিং, বিআইএফসি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, সিভিসি ফাইন্যান্স, জিএসপি, প্রিমিয়ার লিজিং, হজ ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স, বে লিজিং, উত্তরা ফাইন্যান্স এবং ইউনিয়ন ক্যাপিটাল।
বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ার ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়াকড়ি, পুনঃতপশিল নীতি এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির ফলে আদায় কিছুটা বাড়ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সংস্কার প্রয়োজন।
অন্যদিকে ব্যাংক খাতেও মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ২৪.১৩%। ডিসেম্বরে এটি ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা—অর্থাৎ ৭৪ হাজার ৫৭০ কোটি টাকার লাফ।
গবেষক এম হেলাল আহমেদ জনি গণমাধ্যমকে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর লুকানো খেলাপির চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। আগের সরকারের আমলে প্রভাব খাটিয়ে খেলাপির তথ্য চাপা দেওয়া হয়েছে। এখন সময় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার।