বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন
🌟 নিজের শক্তি আর অদম্য মনোবলে যিনি ভেঙেছেন কোটা ব্যবস্থার ছক, জয় করেছেন প্রশাসন ক্যাডার — এই প্রতিবন্ধী তরুণের গল্প আপনাকে নাড়িয়ে দেবে
অনলাইন ডেস্ক
জীবন সব সময় সহজ রাস্তা দেয় না, কিন্তু যিনি নিজের ভেতরের আগুনকে জ্বালিয়ে রাখেন, তাঁর পথ কেউ আটকাতে পারে না। ঠিক যেমন করে দেখিয়েছেন শরীয়তপুরের ছেলে উল্লাস পাল, যিনি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ৪৪তম বিসিএস পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত প্রশাসন ক্যাডার অর্জন করেছেন—তাও একটিবারের জন্যও ‘প্রতিবন্ধী কোটা’ না নিয়ে।
উল্লাস পালের হাত ও পা জন্মগতভাবে বাঁকা। ডান হাতে কোনো শক্তি নেই, ফলে লিখতেও অসুবিধা হয়। পা বাঁকা বলে হাঁটাতেও সমস্যা। তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা কখনোই তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করেনি। বরং বরাবরই নিজেকে ভাবতেন একদম সাধারণ মানুষের মতো—প্রতিযোগিতায় সামনের সারিতে থাকার মতোই যোগ্য।
তিনি বলেন, ‘স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরিক্ষেত্রে কখনো কোটা নেইনি। সব সময় সাধারণ প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই এগিয়েছি।’
ছোটবেলায় অন্য শিশুদের মতো সময়মতো হাঁটা শেখেননি উল্লাস। তাঁর হাত-পা বাঁকা দেখে অনেকে হতাশ হলেও, তাঁর পরিবার কিন্তু কোনো কিছুর কমতি রাখেনি। মা-বাবা তাঁকে ভারতে পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। চিকিৎসা সফল হয়নি, কিন্তু তিনি ধীরে ধীরে হাঁটা শিখেছিলেন। শুরু হয় তাঁর এক ব্যতিক্রমী পথচলা।
প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় শরীয়তপুরের কার্তিকপুর পালপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। এরপর কার্তিকপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫, আর ঢাকার নর্দান কলেজ বাংলাদেশ থেকেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে, যেখানে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ৪৬৩তম হন—সেটিও কোটা ছাড়াই!
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘প্রতিবন্ধী কোটা নেওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে সাধারণ প্রার্থীদের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় সফল হব।’
এই আত্মবিশ্বাস নিয়েই তিনি অংশ নেন বিসিএস যুদ্ধে।
তবে এই পথটা একেবারে মসৃণ ছিল না। ৪০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় একজন পরীক্ষক তাঁর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন, ‘প্রশাসন ক্যাডারে তো অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হয়, আপনি পারবেন?’—এই প্রশ্ন উল্লাসকে মানসিকভাবে আহত করলেও থামাতে পারেনি। বরং এই কথাই তাঁকে আরও দৃঢ় করে।
৪৪তম বিসিএসে অবশেষে তাঁকে বুঝে-শুনে মূল্যায়ন করা হয়। পরীক্ষকরা ছিলেন সহানুভূতিশীল এবং উৎসাহদায়ী। উল্লাস বলেন, ‘প্রতিবন্ধকতা মানুষের ইচ্ছাশক্তি থামিয়ে রাখতে পারে না। নেতিবাচক কথা বলে কাউকে ছোট করা উচিত নয়।’
আজ উল্লাস পাল শুধু একজন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারই নন, বরং তরুণ প্রজন্মের অনুপ্রেরণার প্রতীক। শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষের আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম আর মানসিক শক্তিই তাকে এগিয়ে নেয়।
তাঁর এই জয় আমাদের শেখায়—স্বপ্ন যদি সত্যি করার সাহস থাকে, তবে প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা নয়।