মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:০০ অপরাহ্ন
মাত্র ২০৩ সেকেন্ডেই ধ্বংস ভারতের মহাকাশ মিশন!
অনলাইন ডেস্ক
ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO) তাদের ১০১তম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ মিশনে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে, যা অনেকটাই রোমাঞ্চকর এবং নাটকীয় এক মুহূর্তে পরিণত হয়েছে। রোববার, ১৮ মে সকালে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সময় সকাল ৫টা ৫৯ মিনিটে পিএসএলভি-সি৬১ (PSLV-C61) রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়। এই রকেটের লক্ষ্য ছিল ১,৬৯৬ কেজি ওজনের ইওএস-০৯ (EOS-09) স্যাটেলাইটটিকে পৃথিবীর সান-সিঙ্ক্রোনাস পোলার অরবিটে ৫২৪ কিলোমিটার উচ্চতায় স্থাপন করা। কিন্তু মহাকাশ অভিযানের সেই প্রত্যাশিত যাত্রা মাত্র ২০৩ সেকেন্ডের মাথায় শেষ হয়ে যায়।
ইসরোর প্রধান পরিচালক ভি নারায়ণান লাইভ সম্প্রচারে জানান, উৎক্ষেপণের প্রাথমিক দুই ধাপ অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হলেও তৃতীয় ধাপে হঠাৎ করে যান্ত্রিক ত্রুটির উদ্ভব ঘটে। সেই মুহূর্তে রকেটের গতি ও অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে ইসরোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় যে, অভিযানকে অব্যাহত রাখলে বিপর্যয় আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। তাই বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে তৎক্ষণাৎ অভিযান বাতিল করে রকেটটিকে মহাকাশেই ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমন সিদ্ধান্ত ইসরোর ইতিহাসে বিরল হলেও এটি একটি দায়িত্বশীল এবং নিরাপদ পদক্ষেপ ছিল বলে অনেক মহাকাশ বিশ্লেষক মনে করছেন।
ইসরো তাদের এক সরকারি বিবৃতিতে জানায়, উৎক্ষেপণের দ্বিতীয় ধাপ পর্যন্ত রকেটটি নিখুঁতভাবে কাজ করছিল। কিন্তু তৃতীয় ধাপে প্রবেশের পর “নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে” অভিযান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মানে, ইসরো আগে থেকেই সম্ভাব্য ঝুঁকির পূর্বাভাস পেয়ে বাস্তবায়নে প্রস্তুত ছিল, যা তাদের আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতারই প্রতিফলন। তবে, ঠিক কী ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটেছিল, তা বিস্তারিতভাবে জানতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—ইসরোর অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ধরা হওয়া পিএসএলভি রকেটের এই সংস্করণে হঠাৎ এমন ব্যর্থতা কেন? পিএসএলভি সাধারণত বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণ বাহন হিসেবে খ্যাত। ফলে এই ব্যর্থতা শুধুই একটি প্রযুক্তিগত বিপর্যয় নয়, বরং ইসরোর জন্য এক গুরত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও বটে। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা হিসেবে ইসরো বিগত এক দশকে চন্দ্রযান-৩, মার্স মিশনসহ একাধিক চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু এই ব্যর্থতা তাদের পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনল।
রকেট ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। তবে ইসরো আশ্বস্ত করেছে যে, এ থেকে যেন কোনো ধরনের জননিরাপত্তার ঝুঁকি না হয়, সেজন্য আগাম সতর্কতা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার সামগ্রিক দিক বিবেচনায় এটি একটি “স্মার্ট ফেইল” বলেই বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে ক্ষয়ক্ষতি না বাড়িয়ে দ্রুত সিস্টেম থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইসরোর এই ব্যর্থতা নিঃসন্দেহে একটি মানসিক ধাক্কা, তবে এতে তাদের ভবিষ্যৎ অভিযান থেমে যাবে না। বরং সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা আরও নির্ভরযোগ্য ও সফল মিশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ভবিষ্যৎ রকেট নকশা ও উৎক্ষেপণ কৌশল হালনাগাদ করা হবে।
এই ঘটনা যেমন প্রযুক্তিগত জটিলতার পরিচায়ক, তেমনি একটি পরিপক্ব ও প্রতিক্রিয়াশীল মহাকাশ সংস্থার সংকল্পের প্রতিফলনও বটে। ব্যর্থতা কখনও শেষ নয়; বরং তা হতে পারে আরও বড় সাফল্যের শুরু। ইসরোর জন্যও হয়তো এই ঘটনাটিই হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতের আরও নির্ভরযোগ্য এবং উন্নত মহাকাশ অভিযানের পাথেয়।