বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০২:০৮ অপরাহ্ন
রেকর্ড ঋণ শোধ, হুমকিতে দেশের বাজেট ভারসাম্য
অনলাইন ডেস্ক
বিদেশি ঋণ পরিশোধে নতুন এক আর্থিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। দেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো এক অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে পরিশোধের অঙ্ক ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন সংস্থার কাছে মোট ৪ হাজার ৮৭ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানায়, এই পরিশোধের মধ্যে ঋণের মূলধন ছিল ২৫৯৫ মিলিয়ন ডলার এবং সুদের পরিমাণ ছিল ১৪৯১ মিলিয়ন ডলার।
আগের অর্থবছরে এই দুই খাতে পরিশোধ ছিল যথাক্রমে ২০২০ মিলিয়ন ও ১৩৪৯ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মূলধন পরিশোধে ২৯ শতাংশ এবং সুদ পরিশোধে ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এক দশকে অবকাঠামো খাতে নেওয়া বৃহৎ ঋণ প্রকল্প এবং বাজেট সহায়তা গ্রহণের কারণে এই চাপ তৈরি হয়েছে। এসব ঋণের অনুগ্রহকাল শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন পরিশোধ শুরু হয়েছে।
ইআরডি সূত্রে জানা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ আরও কয়েকটি বিশাল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই শুরু হবে। যার ফলে ভবিষ্যতে আরও বড় চাপ আসছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ গণমাধ্যমকে বলেন, ২০১৬-১৭ সাল থেকে যেসব বড় প্রকল্পে ঋণ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোতেই বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়। বাজেট ফুলিয়ে তৈরি করা এসব প্রকল্পে অর্থনৈতিক লাভজনকতার যাচাই ছিল না। ফলে দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থার কারণে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা দ্বিগুণ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ের অর্থনৈতিক সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যায়। তখন বাজেট সহায়তার নামে এমন অনেক ঋণ নেওয়া হয়েছে, যেগুলোর পরিশোধকাল অল্প এবং সুদের হার ছিল বেশি। এখন এসব ঋণের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে অর্থনীতি চাপে পড়েছে।
অন্যদিকে নতুন ঋণ গ্রহণেও দেখা গেছে ধীরগতি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মাত্র ৮ হাজার ৩২৩ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে অর্থছাড়ও কমেছে, যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৬৮ মিলিয়নে, যেখানে আগের বছর ছিল ১০ হাজার ২৮৩ মিলিয়ন ডলার।
ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনিক স্থবিরতা ও বিদেশি ঠিকাদারদের কার্যক্রমে অনীহার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এসেছে। অন্যদিকে, সরকারের মধ্যমেয়াদি ঋণ কৌশল অনুযায়ী নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ গ্রহণ সীমিত করা হয়েছে। তবে বাজেট ঘাটতি পূরণে ৩৪০০ মিলিয়ন ডলারের রেকর্ড সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ২৮৪০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে ১০০০ মিলিয়ন ডলার সরাসরি বাজেট সহায়তা। এরপর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২০০০ মিলিয়ন এবং জাপান ১৮৯০ মিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে অর্থছাড়ের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে এডিবি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন সময় এসেছে ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশল গ্রহণের। ভবিষ্যতে যেন ঋণের বোঝা অর্থনীতি ও বাজেট ব্যবস্থাকে ভেঙে না দেয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। শুধু ঋণ নেওয়ার দিকেই না তাকিয়ে, তা কতটা লাভজনক এবং সময়মতো পরিশোধযোগ্য, সেটা মূল্যায়ন করাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।