বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪২ পূর্বাহ্ন
বন্ধুত্ব, প্রতিযোগিতা আর ৪-এ ৪—বুয়েটে ইতিহাস গড়লেন দুই বিস্ময় তরুণ
অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো শোনা যায়নি। ২০১৮ ব্যাচের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের দুই বন্ধু আহমদ মাহির সুলতান (রুমী) ও তানযীম আজওয়াদ জামান টানা আট সেমিস্টারে অর্জন করেছেন পারফেক্ট ৪-এ ৪ সিজিপিএ। আর এতেই তৈরি হয়েছে এক ‘মধুর সংকট’। কারণ, নিয়ম তো সোজা—যাঁর সিজিপিএ সবচেয়ে বেশি, তিনি-ই পাবেন আচার্য স্বর্ণপদক। কিন্তু এবার তো দুই জনই সমানভাবে যোগ্য!
নটর ডেম কলেজের একই ব্যাচ থেকে আসা এই দুই তরুণ একসঙ্গে বুয়েটের গণ্ডি পেরিয়েছেন, আবার একসঙ্গে গড়েছেন এক অনন্য কীর্তি। দুজনেই এখন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত। মাহির রয়েছেন বুয়েটেই প্রভাষক হিসেবে, অন্যদিকে তানযীম যুক্ত ছিলেন ব্র্যাক ও বুয়েটে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে, তবে সামনে তাঁর পিএইচডি যাত্রা—গন্তব্য কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।
তাঁদের এই অসাধারণ অর্জনের পেছনে রয়েছে নিষ্ঠা, কৌশল আর অসীম মনোযোগ। মাহির বলেন, ‘প্রতিটি কোর্সের গঠন, শিক্ষক, এমনকি বিগত বছরের প্রশ্নপত্র খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করতাম। কোথায় গুরুত্ব দিতে হবে, তা আগেই বুঝে যেতাম।’ অন্যদিকে তানযীম বললেন, ‘নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলাম। ক্লাস টেস্টে ফুল মার্কস রাখার চেষ্টা করতাম, যাতে টার্ম ফাইনালে চাপ না পড়ে।’
শুধু পড়াশোনায় নয়, ছেলেবেলায় থেকেই দুজনই ছিলেন নানা সহশিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয়। মাহির ছিলেন নটর ডেম কলেজের লেখক কুঞ্জের প্রেসিডেন্ট ও সাহিত্যপত্র “ঢাক-ঢোল”–এর সম্পাদক। তানযীম খেলেছেন ফুটবল, জিতেছেন আন্তঃহল ও জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা। গড়েছেন ম্যাথ ক্লাব, পেয়েছেন আজীবন সদস্যপদ। দুজনেই ভালোবাসেন ভায়োলিন বাজাতে, আর এসব কার্যক্রম তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও নেটওয়ার্কিংয়ে এনে দিয়েছে বাড়তি শক্তি।
বন্ধুত্বের শুরু নটর ডেম কলেজে, নবীনবরণে দেওয়া বক্তৃতা থেকেই। এরপর নির্বাচনী পরীক্ষায় পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চে কাছাকাছি আসা। আর বুয়েটে এসে বন্ধুত্বটা রূপ নেয় গভীর সহানুভূতিতে। একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও, সবসময় ছিলেন পারস্পরিক সহায়তায় উদার। মাহির বলেন, ‘আমরা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও, বন্ধু বলেই একে অপরকে সাহায্য করতাম। এমন বন্ধুত্ব গড়ে তোলাটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
তাঁদের শিক্ষক অধ্যাপক মো. সামসুজ্জোহা বায়েজীদ বলেন, ‘বুয়েটের সিএসই-তে ৪-এ ৪ রাখা অত্যন্ত দুরূহ। তারা শুধু মেধাবী নয়, বরং একদম শুরু থেকেই লক্ষ্যভেদী, সৎ আর পরিশ্রমী।’
তাঁদের মতে, শুধু রুটিন করে পড়া নয়, বরং শেখার আনন্দ আর আগ্রহই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। নতুনদের উদ্দেশে তাঁদের পরামর্শ—নিজের পছন্দের বিষয়ের প্রতি ভালোবাসা থাকলেই সাফল্য অনেকটা সহজ হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত কে পাবেন আচার্য স্বর্ণপদক, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু দুজনের বন্ধুত্ব আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা—এই গল্পটাই হয়তো তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ‘পদক’।