সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:৪৫ পূর্বাহ্ন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞ অভিবাসন কর্মকর্তা টম হোম্যান। আগামী জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তাঁর প্রশাসনে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে হোম্যান দেশটির সীমান্তের নিরাপত্তা তদারকি করবেন।
সম্প্রতি সমাপ্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করা রিপাবলিকান দলীয় ট্রাম্প গত রোববার ঘোষণা করেছেন, হোম্যান হবেন তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনের ‘সীমান্ত জার’।
হোম্যানের কয়েক দশকের আইন প্রয়োগ ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন কমানোর পরিকল্পনা করবেন, তা নিয়ে সবার আগ্রহ রয়েছে।
অভিবাসন ছিল ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের প্রধান নীতিগত বিষয়। এখন এই নীতির বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করবেন হোম্যান।
কিন্তু হোম্যান কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে এবং কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজ করবেন?
হোম্যান যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এবং একসময় পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন।
হোম্যান মার্কিন সীমান্তের অভিবাসন সমস্যাকে ৯/১১-এর পর সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তার দুর্বলতা হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং এই সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
গত গ্রীষ্মে রিপাবলিকান জাতীয় সম্মেলনে হোম্যান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘এখনই ব্যাগ গোছানো শুরু করুন।’
তবে ‘সীমান্ত জার’ হিসেবে হোম্যানের ভূমিকা ও তাঁর পরিকল্পনা কী রূপ নেবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। অভিবাসন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয় জড়িত।
তবে হোম্যান ইতিমধ্যেই কিছু ধারণা দিয়েছেন, কীভাবে তিনি সীমান্তের অবৈধ অভিবাসনের বিষয়টি সামলাবেন।
বাইডেন প্রশাসনের নীতিতে পরিবর্তন আনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে অক্টোবর মাসে সিবিএস নিউজের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোম্যান ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি জননিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার হুমকির বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দেবেন এবং পরে অপরাধী নয়—এমন নথিপত্রহীন অভিবাসীদের টার্গেট করবেন।
এই পদ্ধতি বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নীতির উল্টো। বাইডেন প্রশাসন আইস-কে গুরুতর অপরাধী, জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি এবং সাম্প্রতিক সীমান্ত অতিক্রমকারীদের ওপর নজর দিতে বলেছে।
বাইডেন প্রশাসনের নীতি অপরাধে জড়িত নয় এমন নথিপত্রহীন অভিবাসীদের সুরক্ষা দেয়।

নিশানাভিত্তিক গ্রেপ্তার
হোম্যান জানিয়েছেন, তিনি অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার এবং বহিষ্কারের ক্ষেত্রে নিশানাভিত্তিক পদ্ধতি অবলম্বন করবেন।
গত অক্টোবরে সিবিএস নিউজের সেই একই সাক্ষাৎকারে হোম্যানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কীভাবে তিনি অবৈধ অভিবাসী বহিষ্কারের কাজটি করবেন।
উত্তরে হোম্যান বলেছিলেন, শহর বা উপশহরজুড়ে গণগ্রেপ্তার অভিযান চালানো হবে না। এমনকি আটক শিবিরও তৈরি করা হবে না।
হোম্যান বলেন, ‘নিশানা করে অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করা হবে। আমরা কাদের গ্রেপ্তার করব, তা আমরা জানব। সেই ক্ষেত্রে আমরা অনেক অনুসন্ধান এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে তাঁদের খুঁজে পাব।’
পরিবারসহ বিতাড়ন
হোম্যান ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের বিতর্কিত ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এই নীতির ফলে হাজার হাজার অভিবাসী শিশুকে তাদের পিতামাতার থেকে আলাদা করা হয়েছিল।
এই নীতির কারণে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। বিশেষ করে যখন অভিবাসী শিশুদের পৃথক আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল এবং পুনর্মিলনের পরিকল্পনা ছাড়াই তাদের পিতামাতার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছিল।
হোম্যান অবশ্য বলেছেন, তিনি সেই নীতি তৈরি করেননি যা শিশুদের তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল।
তবে, হোম্যান ছিলেন সেই সময় ট্রাম্প প্রশাসনের তিন কর্মকর্তার একজন, যারা এই নীতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। হোম্যানের দাবি ছিল, এটি মানুষের ‘জীবন রক্ষার’ উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল।
হোম্যান ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এবার তিনি সেই নীতি কার্যকর করবেন না।
হোম্যানের কাছে প্রশ্ন ছিল, পরিবার বিচ্ছিন্ন না করে কি তাদের বিতাড়ন করা যেতে পারে? জবাবে তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসী পরিবারের সব সদস্যকে একসঙ্গে (পরিবারসহ) বিতাড়ন করা যেতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান হোম্যান আবারও কর্মস্থলে অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযানের নীতি চালুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি এই নীতিকে কর্মক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০২১ সালে বাইডেন প্রশাসন এই ধরনের অভিযান বন্ধ করে দেয়।
ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে সোমবার হোম্যান বলেন, ‘অভিবাসীদের আশ্রয় দাবি করার অধিকার আছে। বিচারকের সামনে দাঁড়ানোর অধিকারও তাদের রয়েছে। আমরা সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করব। তবে, যদি বিচারক আদেশ দেন যে তাদের ফিরে যেতে হবে, তাহলে আমাদের তাদের ফেরত পাঠাতে হবে।’
প্রথম দিকের ক্যারিয়ার: পুলিশ ও সীমান্ত টহল ৬২ বছর বয়সী হোম্যান তাঁর পেশাজীবন শুরু করেন নিউইয়র্কে একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে। এরপর সীমান্ত টহল এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি প্রায়ই তাঁর সীমান্ত টহল এজেন্ট হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন।
‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমি ছিলাম একজন সীমান্ত টহল এজেন্ট। আমি সেই ইউনিফর্ম পরেছি, এবং আমি গর্বিত যে আমি এটি পরেছিলাম… আমি প্রথম আইস পরিচালক, যিনি পেশাগতভাবে বিভিন্ন স্তর পার হয়ে এই পদে এসেছি।’
২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে আইস-এর বিতাড়ন শাখার প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন। তখন সংস্থাটি বিপুলসংখ্যক অবৈধ অভিবাসীকে বিতাড়ন করে।
হোম্যান তাঁর কর্মের জন্য প্রেসিডেনশিয়াল র্যাঙ্ক পুরস্কার পান, যা যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল সার্ভিস কর্মীদের জন্য সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।
ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর, দ্বিতীয় সপ্তাহেই হোম্যানকে আইসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। এই পদে তিনি ২০১৮ সাল পর্যন্ত কাজ করেন।
পরবর্তীতে ট্রাম্প তাঁকে সংস্থার স্থায়ী পরিচালক হিসেবে মনোনীত করেন, কিন্তু সিনেটে এই মনোনয়ন নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, ফলে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বর্তমানে হোম্যান রক্ষণশীল গণমাধ্যম ফক্স নিউজের কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করছেন এবং ২০২২ সালে তিনি হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের একজন ভিজিটিং ফেলো হিসেবে যোগ দেন। তিনি ফাউন্ডেশনের ‘প্রজেক্ট ২০২৫’-এর জন্যও কাজ করেন, যা অতি-রক্ষণশীল রাজনৈতিক নীতিমালার প্রস্তাব দেয়।
এই নীতি প্রস্তাবে মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণের জন্য তহবিল বৃদ্ধি এবং আরও শক্তিশালী সীমান্ত পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি অভিবাসন ফি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
যদিও ট্রাম্প তাঁর প্রচারের সময় নিজেকে এই এজেন্ডা থেকে দূরে রেখেছিলেন।