শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন
গত ১৫ বছরে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো প্রবাসে কর্মী পাঠানোর নামে হুন্ডির মাধ্যমে যে পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছে, তা দিয়ে অন্তত চারটি মেট্রোরেল নির্মাণ সম্ভব হতো বলে জানিয়েছে অর্থনীতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি।
রবিবার দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদন জমা দেন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এই প্রতিবেদনে প্রবাসী কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত এক দশকে প্রবাসে কর্মী পাঠানোর জন্য ভিসার আড়ালে হুন্ডির মাধ্যমে ১৩.৪ লাখ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এই পরিমাণ অর্থ ঢাকা মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬ (উত্তরা থেকে মতিঝিল) প্রকল্পের ব্যয়ের চারগুণ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই সিন্ডিকেট এবং নিপীড়নমূলক নিয়োগ পদ্ধতির কারণে প্রবাসী শ্রমিকরা ন্যায্য কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়েছেন, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ব্যাংক খাতের দুরবস্থা নিয়েও প্রতিবেদনে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা ব্যাংক খাতে সংকট আরও গভীর করেছে। এই সময়ে অনিয়ম এবং ঋণখেলাপির যে মাত্রা দেখা গেছে, তা দিয়ে ১৪টি ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প অথবা ২৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব হতো।
এছাড়াও, ক্রমবর্ধমান ঋণখেলাপি এবং উচ্চ-পর্যায়ের আর্থিক কেলেঙ্কারি দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করেছে। মূলধন উৎপাদনশীল খাত থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সময়ে বিভিন্ন অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে ব্যাংক থেকে ঋণ বের করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এমনকি অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। এর ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যার উচ্চ মূল্য দিতে হচ্ছে এখন ব্যাংকসহ পুরো অর্থনীতি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এই প্রতিবেদনের বিষয়ে বলেন, “দেশের আর্থিক খাতের স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা গভীরভাবে কাজ করছি। খেলাপি ঋণের হার সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে ক্রমাগত বাড়ছে। সামনের দিনগুলোতে এটি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। খেলাপি ঋণের বেশিরভাগই বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং কয়েকটি গ্রুপের কাছ থেকে এসেছে।”
তিনি আরও বলেন, “খেলাপি ঋণের মধ্যে আড়াই লাখ কোটি টাকা এস আলম গ্রুপ এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মতো বড় ব্যবসায়ীদের ঋণের অংশ। এই ঋণগুলোর একটি বড় অংশ ২০১৭ সালের পরে নেওয়া হয়েছে এবং তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।”
প্রতিবেদন হস্তান্তরের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন সাথী এবং সিনিয়র সচিব লামিয়া মোর্শেদসহ আরও অনেকে।