বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৯:৫৩ অপরাহ্ন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ককে মূলত অবৈধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আপিল আদালত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রায় ট্রাম্পের বৈদেশিক নীতি ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনকে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সুযোগ দিতে আপিল আদালত ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত শুল্ক কার্যকর রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এই রায় এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা সুপ্রিম কোর্টে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে এ বছর ট্রাম্পের অর্থনৈতিক দর্শনকে ঘিরে এক নজিরবিহীন আইনি সংঘাত শুরু হতে পারে।
সাত বনাম চার ভোটে দেওয়া রায়ে ইউএস ফেডারেল সার্কিট কোর্ট জানায়, জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের (আইইইপিএ) আওতায় ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ আইনসিদ্ধ নয়। আদালতের ভাষায়, এ সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘন করে এবং তাই শুল্কগুলো অবৈধ।
রায় ঘোষণার পরপরই ট্রাম্প তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। নিজের প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ তিনি লেখেন, “যদি এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকে, তবে তা আমেরিকাকে ধ্বংস করবে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, “পক্ষপাতদুষ্ট বিচারকরা ভুলভাবে রায় দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমেরিকাই জয়ী হবে।”
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, “যদি এই শুল্ক তুলে নেওয়া হয়, তবে দেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়বে। এতে আমেরিকার অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে। অথচ আমাদের শক্তিশালী থাকা অপরিহার্য।”
আইইইপিএ’র ক্ষমতাকে ভিত্তি করে ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট জাতীয় নিরাপত্তার অস্বাভাবিক হুমকির বিরুদ্ধে বাণিজ্যে পদক্ষেপ নিতে পারেন। তিনি বাণিজ্য ঘাটতিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে ঘোষণা করেছিলেন।
কিন্তু আপিল আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, শুল্ক আরোপ প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার বাইরে। এটি মূলত কংগ্রেসের একচ্ছত্র এখতিয়ার। তাই আদালতের মতে, ট্রাম্পের পদক্ষেপ ‘আইনের পরিপন্থী’।
১২৭ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়েছে, আইইইপিএতে কোথাও ‘শুল্ক’ শব্দটির উল্লেখ নেই। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়ার কোনো সুরক্ষাও এই আইনে নেই। সুতরাং কর ও শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পুরোপুরি কংগ্রেসের অধীনেই থাকবে।
আদালত লিখেছে, “১৯৭৭ সালে কংগ্রেস যখন এই আইন পাশ করেছিল, তখন এর উদ্দেশ্য ছিল না প্রেসিডেন্টকে সীমাহীন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া। বরং আইন স্পষ্টভাবে বলে, কংগ্রেস চাইলে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা দিতে পারে, কিন্তু তখন সরাসরি ‘ট্যারিফ’ বা ‘ডিউটি’ শব্দ ব্যবহার করতে হবে।”
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং একাধিক অঙ্গরাজ্যের জোট করা দুই মামলার প্রেক্ষিতে এই রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
মামলাগুলো হয়েছিল ট্রাম্পের গত এপ্রিলে জারি করা নির্বাহী আদেশের পর। সেই আদেশে তিনি বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ মূল শুল্ক এবং ডজনখানেক দেশের ওপর অতিরিক্ত ‘পারস্পরিক শুল্ক’ আরোপ করেছিলেন। এবং দিনটিকে ঘোষণা করেছিলেন ‘অন্যায্য বাণিজ্যনীতির হাত থেকে মুক্তির দিন’ হিসেবে।
পরে মে মাসে নিউইয়র্কের কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডও এই শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। তবে আপিলের কারণে রায় কার্যকর হয়নি।
নতুন রায়ে শুধু বৈশ্বিক শুল্ক নয়, কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের ওপর আরোপিত শুল্কও বাতিল করা হয়েছে। যদিও ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক বহাল থাকছে, কারণ সেগুলো অন্য আইনের ভিত্তিতে আরোপিত।
হোয়াইট হাউসের আইনজীবীরা রায় ঘোষণার আগে যুক্তি দিয়েছিলেন, এসব শুল্ক হঠাৎ বাতিল হলে ১৯২৯ সালের মহামন্দার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাদের দাবি ছিল, “আইইইপিএর আওতায় শুল্ক ক্ষমতা বাতিল হলে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও বৈদেশিক নীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।”
আইনজীবীরা আরও বলেন, এসব শুল্ক বাতিল হলে যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি দেশগুলোর কাছে ট্রিলিয়ন ডলার ফেরত দিতে হবে, যা অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে—যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক হ্রাসের চুক্তি করেছিল, সেই চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে?
এখন যদি সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি গ্রহণ করে, তবে নয়জন বিচারপতি নির্ধারণ করবেন, ট্রাম্পের শুল্ক কর্মসূচি আইনসিদ্ধ ছিল নাকি এটি প্রেসিডেন্টের সীমালঙ্ঘনের নতুন উদাহরণ।
তবে আপিল আদালতে হেরে গেলেও হোয়াইট হাউস সামান্য স্বস্তি পাচ্ছে এই ভেবে যে ১১ বিচারকের মধ্যে মাত্র তিনজন রিপাবলিকান মনোনীত। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টে ছয়জন রিপাবলিকান বিচারকের মধ্যে তিনজন ট্রাম্পের নিয়োগপ্রাপ্ত। তাই সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত লড়াই রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।