বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫১ অপরাহ্ন
আর মাত্র দুদিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দীর্ঘ সময় পর ব্যালটের এই গুরুত্বপূর্ণ লড়াইকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন চরম উত্তেজনায় টগবগ করছে। শেষ পর্যায়ে এসে নির্বাচনী প্রচার পৌঁছেছে সর্বোচ্চ চূড়ায়। রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত দিনরাত চলছে প্রার্থী ও শীর্ষ নেতাদের গণসংযোগ। এই নির্বাচনী আবহে ভোটারদের আস্থা অর্জনের প্রধান কৌশল হিসেবে সামনে এসেছে এলাকাভিত্তিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের কেন্দ্রীয় ইশতেহারের পাশাপাশি স্থানীয় সমস্যা সমাধান ও জনকল্যাণমূলক অঙ্গীকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে সামনে রেখে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টানা সফর চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হচ্ছে নির্দিষ্ট জেলা ও অঞ্চলের জন্য পরিকল্পিত উন্নয়ন রূপরেখা। একদিকে তারেক রহমান উত্তরাঞ্চলের রুগণ শিল্প ও কৃষি সম্প্রসারণের কথা বলছেন, অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমান তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন ও সিলেট অঞ্চলে প্রবাসী সেবার মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এই আঞ্চলিক মনোযোগ ভোটারদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করাই হবে ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। এরপর তিনি দেশের ২৯টি বিভাগ ও জেলা সফর করেন। প্রতিটি জনসভায় আগামী পাঁচ বছরে ক্ষমতায় এলে সংশ্লিষ্ট এলাকার জন্য কী কী করা হবে, তার স্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, স্বাস্থ্য কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, ঠাকুরগাঁওয়ে পুরোনো বিমানবন্দর চালু, রুগণ ও কৃষিভিত্তিক শিল্প উন্নয়ন, ফরিদপুরে ভুট্টা চাষের সম্প্রসারণ, বরিশাল-ভোলা সেতু নির্মাণ, কুমিল্লায় ইপিজেড সম্প্রসারণ এবং দিনাজপুরে আম-লিচু চাষ বৃদ্ধির অঙ্গীকার করেন তিনি।
২২ জানুয়ারি সিলেটের প্রথম জনসভার আগে এক পলিসি ডায়ালগে তিনি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন কাজ দ্রুত শেষ করার আশ্বাস দেন। একই দিনে মৌলভীবাজারে বক্তব্যে তিনি অবকাঠামোগত দুরবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, ঢাকা থেকে সিলেট আসতে আট ঘণ্টা লাগে, যা লন্ডন যাওয়ার সময়ের কাছাকাছি। আগামী দিনে পরিবর্তন চাইলে ধানের শীষের সরকার দরকার।
তারেক রহমান ‘কৃষি কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সার, কৃষিঋণ ও শস্যবীমা সুবিধা এবং ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নারীদের মাসিক আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
উত্তরবঙ্গ সফরে তিনি ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু, ক্যাডেট কলেজ স্থাপন এবং রুগণ শিল্প পুনরুজ্জীবনের ঘোষণা দেন। রাজশাহীতে আইটি পার্ক সচল, আইটি ভিলেজ স্থাপন ও পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের আশ্বাস দেন। চট্টগ্রামে বন্দরনগরীকে প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী এবং ঢাকায় যানজট নিরসন ও নতুন খেলার মাঠ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও প্রচারণায় আঞ্চলিক সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। সিলেটের জনসভায় তিনি খনিজসম্পদ, প্রবাসী অধিকার, সুপেয় পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলেন। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কার্যকর করা, নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু এবং প্রবাসীদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনার প্রতিশ্রুতি দেন।
লালমনিরহাটে তিনি তিস্তা নদীকে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার ঘোষণা দেন। কুড়িগ্রামে সীমান্ত হত্যা বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। ফরিদপুর বিভাগ ঘোষণা, বগুড়া ও দিনাজপুরকে সিটি করপোরেশনে উন্নীতকরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অঙ্গীকার করেন তিনি।
গাজীপুরে ওভারপাস ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার, মহেশখালীতে স্মার্ট ইকোনমিক জোন এবং কক্সবাজারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথাও জানান জামায়াত আমির।
বিএনপি ও জামায়াতের বিপুল প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিশ্লেষকদের মতভেদ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, দলগুলো অঞ্চলভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তবে বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের বড় অংশ বাস্তবায়ন না হওয়ার নজির রয়েছে। ফলে যেই দলই ক্ষমতায় আসুক, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। এখন পুরো দেশ জুড়ে বইছে নির্বাচনী উৎসব আর প্রতিশ্রুতির ঢেউ।