শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন
শুরু হয়েছে বাঙালির ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি। খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় এই মাসের আগমনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বাংলার গৌরবময় ইতিহাস; বাঙালির সংগ্রাম ও অর্জনের কাহিনি।
ফেব্রুয়ারি বাঙালির কাছে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের মাস নয়। এটি আত্মত্যাগ, প্রতিবাদ এবং ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের সংগ্রামের প্রতীক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে জীবন উৎসর্গের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা পায় মাতৃভাষার অধিকার।
১৯৫২ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ ৭৪ বছরে রক্তমাখা ইতিহাস ও আত্মত্যাগের গৌরব পুরো বাংলাকে করেছে মর্যাদাশীল। তাই তো ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলা ভাষা আজ বিশ্বমুখী।
ভাষা আন্দোলনের মাসের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় নানা কর্মসূচি। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মাসব্যাপী বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে ভাষা আন্দোলনের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয়।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পবিত্র রমজানসহ একাধিক ইস্যুর কারণে এবার ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই শুরু হচ্ছে না অমর একুশে গ্রন্থমেলা।
ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে ১৯৯৯ সালে। ওই বছর ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস অনুযায়ী, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি ও মুসলিম লিগের প্রধান মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক সমাবেশে ঘোষণা দেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বক্তব্য দেওয়ার পর কয়েকজন শিক্ষার্থী ‘না’ ‘না’ বলে প্রতিবাদ জানান, যা জিন্নাহকে অপ্রস্তুত করে তোলে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা তার কাছে একটি স্মারকলিপিও প্রদান করেন, যেখানে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। সেখান থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা। দীর্ঘ এই আন্দোলন ১৯৪৭ সাল থেকে চলতে থাকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত।
বাংলা ভাষার সমমর্যাদার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন ধীরে ধীরে জোরালো হয়ে ওঠে। আন্দোলন দমাতে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ, মিছিল ও সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীরা একযোগে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিকটে পৌঁছালে পুলিশ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে।
এতে শহীদ হন সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ আরও অনেকে। তাদের এই আত্মত্যাগের বিনিময়েই বাঙালি জাতির কাছে চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় মাতৃভাষার মর্যাদা।