শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২৯ অপরাহ্ন
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এমন এক সুরক্ষাকবচ, যার মাধ্যমে সমাজের অসহায়, দুস্থ ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়। আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের সামাজিক নীতির অপরিহার্য উপাদান হলেও এর শেকড় সুদূর অতীতে প্রোথিত। প্রাচীন সভ্যতাগুলোতেও সামাজিক সহায়তার নানা দৃষ্টান্ত ছিল। যদিও তা বর্তমানের মতো সুসংগঠিত ছিল না, তবুও দানশীলতা, মানবিকতা ও ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় ব্যক্তি ও রাষ্ট্রপর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হতো। প্রাচীন মিসর, গ্রিস, রোম, চীন ও ভারতে এর উদাহরণ পাওয়া যায়। বিশ্বমানবতার মহান পথপ্রদর্শক হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২২ সালে ন্যায়, সাম্য ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে যে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, খোলাফায়ে রাশেদিন সেই সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোকে সুসংহতভাবে বাস্তবায়ন করে মানবকল্যাণে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব মানবসমাজের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে ইসলাম কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আর্থিক সহায়তার সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছে। সম্পদ যেন কেবল ধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত না থাকে, সে জন্য দরিদ্রের নির্ধারিত অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনে ধনাঢ্য মুসলমানদের ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক। এর ফলে শুধু দরিদ্রের কষ্ট লাঘবই নয়, আয়বণ্টনে ভারসাম্যও প্রতিষ্ঠিত হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে।’
ধনীদের সম্পদের ৪০ ভাগের এক অংশ জাকাত হিসেবে প্রদান করলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যের কঠোর আঘাত থেকে মুক্তি পেতে পারে। জাকাতের মাধ্যমে ঋণগ্রস্ত, অনাথ, বিধবা, বৃদ্ধ, রুগ্ণ ও অক্ষম মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগ পায়।
সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাকাতের অর্থ বিতরণ করা হলে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যথাযথভাবে জাকাত আদায় হলে সমাজে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘তাদের ধনসম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক।’
জাকাত ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বণ্টন প্রক্রিয়া। শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি বিশেষ গুরুত্বপ্রাপ্ত। কোরআনে সালাত কায়েমের নির্দেশের পরপরই বহু স্থানে জাকাত আদায়ের নির্দেশ এসেছে। ১৬টি স্থানে ‘সাদাকাহ’ শব্দে এর উল্লেখ রয়েছে।
ভূমিজ ফসলের জাকাত ‘উশর’ নামে পরিচিত। গচ্ছিত অর্থ, স্বর্ণ-রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য, গবাদিপশু, খনিজ ও কৃষিজ উৎপাদনের ওপর জাকাত ফরজ করা হয়েছে। ধর্মীয় ও নৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কোরআনের ৩২টি স্থানে সরাসরি জাকাত প্রদানের নির্দেশ রয়েছে। আবু বকর (রা.) জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছিলেন।
জাকাতের মূল লক্ষ্য হলো গ্রহীতাকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা, যাতে সে ভবিষ্যতে দাতা হতে সক্ষম হয়। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত অনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে জাকাত বিতরণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবস্থার স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি ভিক্ষাবৃত্তির মানসিকতা তৈরি করছে, কারণ প্রাপকদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সাহায্য সংগ্রহ করতে হয়।
জাকাত যে প্রকৃত সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি, তার সুফল পেতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারি তত্ত্বাবধানে বাধ্যতামূলকভাবে জাকাত সংগ্রহ ও সুশৃঙ্খল বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে দেশের দারিদ্র্য অনেকাংশে হ্রাস পেতে পারে।
লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান