বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৩ অপরাহ্ন
নীরব ঘাতক হেপাটাইটিস: প্রতি সেকেন্ডেই কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ
অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত প্রায় ১ কোটি মানুষ জীবনধারণে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে। এদের মধ্যে অন্তত ১০ লাখ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত, যাদের পরীক্ষানিরীক্ষা বাবদ খরচ হচ্ছে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বজুড়ে লিভার ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে হেপাটাইটিস বি ও সি। প্রতি সেকেন্ডেই এই প্রাণঘাতী ভাইরাস একজনের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। এ ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে আজ ২৮ জুলাই ২০২৫ পালিত হচ্ছে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস।
নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী বারুচ স্যামুয়েল ব্লমবার্গ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আবিষ্কার করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিপ্লব ঘটান। তিনি এই ভাইরাস শনাক্তে আধুনিক পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করেন এবং টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধের পথ তৈরি করেন। তার জন্মদিন ২৮ জুলাই-কে সম্মান জানিয়ে প্রতিবছর এই দিনটিতে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উদ্যাপন করা হয়।
‘হেপাটাইটিস’ শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘হেপার’ ও ‘টাইটিস’ থেকে, যার অর্থ যকৃৎ ও প্রদাহ। সাধারণত এটি শুরু হয় জ্বর, ক্ষুধামান্দ্য, বমিভাব, পেটে ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দিয়ে। এরপর দেখা দিতে পারে জন্ডিস, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, ফ্যাকাশে মল, এমনকি মারাত্মক লিভার ফেইলিওরও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশেও দিন দিন বাড়ছে লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসই প্রধান ভূমিকা রাখছে। দেশের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের পেছনে এই ভাইরাস দায়ী। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ লিভারজনিত জটিলতায় মারা যাচ্ছেন। এই রোগের চিকিৎসায় খরচ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত ১০ লাখ মানুষের শুধু পরীক্ষার পেছনেই খরচ হচ্ছে কমপক্ষে ১ বিলিয়ন ডলার। এদের মধ্যে মাত্র ৫০ শতাংশ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ই পৌঁছাচ্ছে ৩ বিলিয়ন ডলারে। দেশের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের ১০-১২ শতাংশই লিভারের রোগে আক্রান্ত, যার বেশিরভাগই হেপাটাইটিস বি-জনিত।
২০১৯ সালের প্রখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট-এর তথ্য অনুসারে, যকৃত ক্যান্সারের ৪২ শতাংশ রোগী দীর্ঘমেয়াদে হেপাটাইটিস বি ও ৩১ শতাংশ রোগী হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন এবং ৬ শতাংশ মানুষ আজীবন এটি শরীরে বহন করছেন। এটি একটি ডিএনএ ভাইরাস যা দীর্ঘমেয়াদে লিভারের জটিল রোগ ও ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) স্বাস্থ্য খাত কৌশল ২০২০ অনুযায়ী, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে কিছুটা সফলতা মিলেছে। বর্তমানে চার বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের হার নেমে এসেছে ০.৯৪ শতাংশে। প্রতি লাখে নতুন সংক্রমণ ২০ জন এবং মৃত্যু ১০ জনে দাঁড়িয়েছে।
WHO লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে চার বছরের নিচের শিশুদের সংক্রমণ হার ০.৫ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ০.১ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। প্রতি লাখে নতুন সংক্রমণ ২০২৫ সালে ১১ জন এবং ২০৩০ সালে মাত্র ২ জনে কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। মৃত্যুহারও ২০২৫-এ প্রতি লাখে ৭ এবং ২০৩০-এ ৪-এ নামিয়ে আনার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
এই ভাইরাস নির্মূলে ২০২২ সালের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কৌশল অনুযায়ী, জন্মের সঙ্গে সঙ্গে টিকার প্রথম ডোজ এবং পরবর্তী সময়ের সব শিডিউল টিকা ৯০ শতাংশের বেশি শিশুকে দেওয়ার টার্গেট রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংক্রমিত রোগীদের মাত্র ৩০ শতাংশই এখনো সঠিকভাবে শনাক্ত ও চিকিৎসা পাচ্ছেন।
গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বক্তব্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সেলিমুর রহমান বলেন, হেপাটাইটিস একটি নীরব ঘাতক। বিশেষত বি ও সি ভাইরাসের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল। এটি দূষিত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমেও ছড়ায়। তাই ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নিরাপদ পানি, বিশুদ্ধ খাবার, সকল রোগীর সঠিক শনাক্তকরণ এবং সহজপ্রাপ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতেই হবে।