বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫১ অপরাহ্ন
রক্তদানের আগে না জানলে জীবন হতে পারে হুমকির মুখে!
অনলাইন ডেস্ক
চট্টগ্রামের এক বেসরকারি হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত এক রোগীকে দেখে ফেরার পর মনে হলো—রক্তদান ও রক্তগ্রহণ বিষয়ে আমাদের অনেক ধারণাই এখনো ভ্রান্ত। এই অজ্ঞতা অনেক সময় রোগীর জীবন বাঁচানোর পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
রোগীটি স্প্লিন অপারেশন করানো। হিমোগ্লোবিন মাত্র ৬; টার্গেট ৭ হওয়ায় দুই ব্যাগ রক্ত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম ব্যাগে সমস্যা না হলেও, দ্বিতীয় ব্যাগ দেওয়ার পরপরই শুরু হয় ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া—গোটা শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, এমনকি প্রস্রাব পর্যন্ত লালচে হয়ে ওঠে। অথচ ব্লাড প্রেসার, পালস, এমনকি তাপমাত্রাও ছিল স্বাভাবিক।
রক্তদাতার গ্রুপ ছিল এক্স আরএইচ নেগেটিভ—উল্লেখযোগ্য যে, তিনি বহুবার সফলভাবে রক্ত দিয়েছেন। তাহলে হঠাৎ এমন প্রতিক্রিয়া কেন?
এখানেই লুকিয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এক মেডিকেল ধাঁধা—উইক ডি বা পারশিয়াল ডি ভ্যারিয়েন্ট। অনেক সময় রক্তদাতার শরীরে আরএইচ নেগেটিভ বলে ধরে নেওয়া হলেও তার রক্তে ‘ডি অ্যান্টিজেন’-এর দুর্বল বা ভিন্ন সংস্করণ থাকতে পারে, যা সাধারণ ব্লাড গ্রুপিং কিট দিয়ে ধরা পড়ে না। অথচ রিসিপিয়েন্টের দেহে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
এই জটিলতা ধরা পড়ত যদি উন্নত গ্রুপিং, অ্যান্টিবডি স্ক্রিনিং ও ক্রসম্যাচ করা হতো। কিন্তু অনেক ব্লাড ব্যাংক এখনো কেবল গ্রুপ মিল করেই রক্ত দেওয়াকে যথেষ্ট মনে করে। এই ধরনের দাতাদের আরএইচ পজিটিভ হিসেবে দাতা হিসেবে গ্রহণ করা হলেও, নিজেরাই রক্ত নিতে গেলে নিতে হয় আরএইচ নেগেটিভ হিসেবেই। এটাই জিনগত জটিলতার বাস্তবতা।
ভাগ্য ভালো, রোগীর পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে ওঠেনি। আরও প্রশংসার বিষয়, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক অন্ধভাবে স্টেরয়েড দিয়ে তা ধামাচাপা না দিয়ে আসল কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন—এটাই একজন প্রকৃত চিকিৎসকের দায়িত্ব।
এই ঘটনাই স্মরণ করিয়ে দেয়—রক্ত মানে কেবল মেডিকেল পণ্য নয়, রক্ত মানে জীবন।
তবে শুধু ব্লাড গ্রুপ মিলেই যেন নিশ্চিন্ত না হই—অদৃশ্য অ্যান্টিবডিগুলো সব গড়বড়ের নেপথ্য নায়ক হতে পারে। অনেক সময় এসব অ্যান্টিবডি কোনো নির্দিষ্ট গ্রুপের সঙ্গেও সম্পর্কিত থাকে না, অথচ ভয়ানক বিপর্যয় ঘটাতে পারে পরিসঞ্চালনের সময় বা গর্ভাবস্থায়। এমনকি ABO ইনকমপ্যাটিবিলিটিও দেখা দিতে পারে, যেখানে বাহ্যত গ্রুপ মিল থাকলেও রোগীর শরীর তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
রক্তদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা নয়, দরকার বিজ্ঞানের আলো, সতর্কতা ও যত্ন। কারণ, রক্তের গ্রুপ মিলে গেলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না—নিরাপদ পরিসঞ্চালনের জন্য চাই আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা।
ডা. আশরাফুল হক
সহকারী অধ্যাপক
ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ