শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:২৫ অপরাহ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের একটি বিশেষ পরিস্থিতি ও উত্তেজনার মাঝে দল-মতনির্বিশেষে সবাইকে একত্র করার উদ্যোগ নেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের বাদে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনটি পর্বে অনুষ্ঠিত এসব বৈঠক জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কার্যকর ও সফল হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা গেছে, মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ।
একজন হিন্দু ধর্মীয় নেতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে হামলা চালায়। এ পরিস্থিতিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক করেন।
সরকারি পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, হিন্দু সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনার ভূমিকা থাকতে পারে। এছাড়া ভারতীয় কর্তৃপক্ষও বিভিন্নভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই পরিস্থিতিতে সংলাপের আয়োজন করে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং তাদের ভারতীয় সহযোগীদের দুটি বার্তা দিতে চেয়েছে। প্রথমত, দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে সরকার আপসহীন। দ্বিতীয়ত, ফ্যাসিবাদ হটাতে গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সবাই এখনও ঐক্যবদ্ধ। এই ঐক্যের চেতনায় দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গ্রেপ্তার, তাঁর জামিন আবেদন নাকচ, আইনজীবী হত্যা, ভারতীয় গণমাধ্যমে উসকানিমূলক অপপ্রচার, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী পাঠানোর প্রস্তাবসহ একাধিক ঘটনার ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব ঘটনার ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মুখে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ড. ইউনূস বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। এর মধ্যে বুধবার বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ৩৫টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দেশের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার ঘোষণা দেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নেয়। গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এই বৈঠক দেশের জনগণকে একটি বার্তা দিয়েছে—আমরা ঐক্যবদ্ধ। সংখ্যালঘুদের বিষয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করা প্রয়োজন।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে এমন পরিস্থিতি অতীতে কখনো সৃষ্টি হয়নি। আবার এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় সংলাপ এবং তার প্রতি সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও নজিরবিহীন। ড. ইউনূস গত বৃহস্পতিবার সব ধর্মের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। তার আগে রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র ও নাগরিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ধর্মকে ব্যবহার করে বিভেদ সৃষ্টির পেছনে বাইরের শক্তির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য। সংলাপে এটাই প্রতিফলিত হয়েছে।’
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, শিগগিরই ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশনসহ ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক হবে। এভাবেই সংলাপের পর্বগুলো সম্পন্ন হবে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় আমরা ঐক্যবদ্ধ। এ সংলাপ সেই ঐক্যের একটি প্রকাশ।’
প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা সরকারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে তারা সরকারের প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সারা দেশে সম্প্রীতি সমাবেশ এবং একযোগে জাতীয় পতাকা হাতে প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রস্তাব দেন অনেকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ভারতের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ছাড়া জাতি যে ঐক্যবদ্ধ, সেই বার্তাটি দেশে-বিদেশে পৌঁছানো প্রয়োজন ছিল। সংলাপের মাধ্যমে সেটি সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি একটি পলিটিক্যাল কাউন্সিল বা জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের মতো প্রস্তাবও এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভারতকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ আর নতজানু নীতি মেনে নেবে না। আমরা সম-অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব চাই।’