মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ন
আল্লাহ তাআলা হলেন সমগ্র বিশ্বের রব। ‘রব’ বলতে বোঝায় সৃষ্টিকর্তা, লালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা। ইসলামি নীতিমালা গুলি সৃষ্টির সুরক্ষার উদ্দেশ্যে নাজিল হয়েছে। শরিয়তের বিধানগুলোর উদ্দেশ্যকে ‘মাকাসিদে শরিয়া’ বলা হয়। মাকাসিদে শরিয়া পাঁচটি মূলনীতি নিয়ে গঠিত, যথা জীবন রক্ষা, সম্পদ রক্ষা, জ্ঞান রক্ষা, বংশ পবিত্রতা রক্ষা, এবং ঈমান আকিদা রক্ষা। মাদক, জুয়া ও ব্যভিচার মানব জীবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনে; এরা মানুষের পরিবার, সম্পদ, বিবেক, বুদ্ধি, মানসম্মান, জীবন এবং আখিরাত—সবকিছু ধ্বংস করে দেয়।
ইসলামে হত্যা নিষিদ্ধ এবং মানব জীবন রক্ষার জন্য হত্যা অপরাধ। জুয়া ও চুরি নিষিদ্ধ এবং চুরির শাস্তি হিসেবে হাত কাটা সম্পদ সুরক্ষার লক্ষ্যে। সব প্রকার মাদকদ্রব্য ও নেশার ব্যবহার নিষিদ্ধ, এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান জ্ঞান ও বিবেকের সুরক্ষার জন্য। কেননা, যদি মানুষের ‘আকল’ বা স্বাভাবিক বুদ্ধি সুরক্ষিত না থাকে, তাহলে সে নিজের, পরিবার, দেশ ও জাতির ক্ষতি করে। ব্যভিচার নিষিদ্ধ, কারণ নারী-পুরুষের বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে বংশগতির পবিত্রতা রক্ষা করা হয়। এর ব্যতীত, মানুষ এবং অন্যান্য জীবের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না।
বিশ্বের সকল অপরাধের মধ্যে তিনটি প্রধান বিষয় জড়িত: অবৈধ অর্থ, মাদক এবং অবৈধ নারীসঙ্গ। মানবসভ্যতার ধ্বংসের কারণও এ তিনটি। কোরআন কারিমে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘(হে রাসুল সা.) লোকেরা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, উভয়ের মধ্যে মহাপাপ রয়েছে এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও আছে; তবে এগুলোর পাপ উপকারের চেয়ে অনেক বেশি।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২১৯)।
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের কিছু চিহ্ন হলো বিদ্যা লোপ পাবে, অজ্ঞতা বৃদ্ধি পাবে, মদ্যপান ও মাদক বিস্তার পাবে এবং ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়বে।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, হাদিস: ৮০)।
ইসলামের পাঁচটি মৌলিক নিষিদ্ধ বিষয়ের মধ্যে নেশা, জুয়া ও অবৈধ নারীসঙ্গ অন্তর্ভুক্ত। কিছু অপরাধ নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব; চাইলে তা এড়ানো যায়। কিন্তু মাদক, জুয়া ও অবৈধ নারীসঙ্গের আকর্ষণ এমন যে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়; ফলে সেখান থেকে বের হওয়া সম্ভব হয় না। অপরাধী চাইলেও অপরাধ তাকে ছাড়ে না; অপরাধ জগত থেকে বের হতে গেলে অপরাধীর অনেক কষ্ট হয়।
মাদক, জুয়া ও ব্যভিচার অপরাধের উৎস, যা অপরাধের শৃঙ্খল তৈরি করে। কোরআন কারিমে হারুত ও মারুতের বর্ণনা এসেছে, যারা মাদক, অবৈধ অর্থের লোভ এবং অবৈধ নারীসঙ্গের কারণে খুন ও অন্যান্য অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১০২; তাফসিরে আজিজি ও মাআরিফুল কোরআন)।
যে বস্তু ব্যবহারে নেশা হয় এবং মানুষের মস্তিষ্ক বিকল হয়, সেই সবকিছুই মাদক। মানবতার সুরক্ষার জন্য ইসলামে মাদককে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ, অপবিত্র ও হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। হজরত আয়শা (রা.) বলেন, ‘যে সমস্ত পানীয় নেশা সৃষ্টি করে, তা হারাম।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, হাদিস: ২৪১)।
‘নবীজি (সা.) রবিআহ গোত্রের প্রতিনিধিদের চারটি কাজের নির্দেশ দেন: আল্লাহর ওপর ইমান আনতে, সালাত কায়েম করতে, জাকাত দিতে এবং রমজান মাসে রোজা পালনে। চারটি কাজ বারণ করেন: শুকনো লাউয়ের খোল, সবুজ কলসি এবং আলকাতরার পলিশকৃত পাত্র (মদপাত্র হিসেবে) ব্যবহার করতে।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, হাদিস: ৮৭)।
মাদক, জুয়া ও ব্যভিচার সব ধর্মেই নিষিদ্ধ এবং প্রতিটি আইনেই গর্হিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। শুদ্ধ, সফল ও পূত-পবিত্র জীবনের জন্য আমাদের নিজেদের, পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এসব অসামাজিক অপরাধের কবল থেকে রক্ষা করতে হবে। দেশের উন্নয়ন এবং জাতির সুরক্ষার জন্য এসব অপরাধের বিরুদ্ধে পরিবারে সচেতনতা তৈরি করা, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রশাসনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।