শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৫১ পূর্বাহ্ন
সন্তানকে নিয়ে মায়ের আত্মহত্যা কিংবা সন্তানকে হত্যা করে বাবার আত্মহত্যার ঘটনা এখন বাংলাদেশেও বিরল নয়। এ ধরনের সংবাদ আমাদের মর্মাহত করে এবং গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। সাধারণ বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে এই ধরনের কাজ অযৌক্তিক, হৃদয়বিদারক এবং নিষ্ঠুর মনে হয়। তা সত্ত্বেও, এই ঘটনা ঘটেই চলেছে। এমন পরিস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেন এ রকম হচ্ছে? বিষয়টি নিয়ে ভাবতে গেলে আর্থসামাজিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন কারণ সামনে আসে। এসব কারণ সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এমন ঘটনার প্রতিরোধ কিছুটা হলেও সম্ভব।
১. মানসিক অসুস্থতা: কিছু ব্যক্তির মানসিক রোগ এমন পর্যায়ে চলে যায় যে তারা স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তারা বাস্তবতাকে ভুল এবং নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। বিষণ্নতা, বাইপোলার ডিজঅর্ডার, সাইকোসিস, প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা মাদকাসক্তি এ ধরনের মানসিক অসুস্থতার অন্যতম কারণ। এসব অবস্থায় অনেকের মধ্যে আত্মহত্যা বা সন্তানসহ আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়।
২. কষ্ট থেকে মুক্তি খোঁজা: কিছু ব্যক্তি তাদের দুর্দশা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হিসেবে মৃত্যু বেছে নেয়। উচ্চমাত্রার বিষণ্নতায় ভোগা ব্যক্তি কখনো নিজের সন্তানকেও এমন সিদ্ধান্তে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। শারীরিক ও মানসিক শক্তির অভাব এবং মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অসামঞ্জস্য তাদের এই চরম পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দেয়।
৩. সামাজিক প্রতিকূলতা: দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দাম্পত্য কলহ, বৈষম্য, নির্যাতন বা দুর্ঘটনার মতো বিষয়গুলো মানসিক চাপ বাড়িয়ে তোলে। এসব প্রতিকূলতা বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তির মনোভাবকে আরও নেতিবাচক করে তোলে, যা তাকে ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে পরিচালিত করে।
৪. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: সামাজিক সহযোগিতার অভাবে অনেকেই একাকীত্ব ও হতাশায় ডুবে যান। বন্ধু, পরিবার বা পরিচিতজনদের কাছ থেকে মানসিক, আর্থিক, বা ব্যবহারিক সহায়তার অভাব এ ধরনের সংকটকে ত্বরান্বিত করে। সহায়তা বঞ্চিত ব্যক্তি সন্তানসহ আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
৫. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে অজ্ঞতা: মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার অভাবে অনেকে পেশাদার সেবা নিতে ভয় পান। মানসিক রোগের জন্য চিকিৎসা নিতে গেলে ‘পাগল’ বলে আখ্যা পাওয়ার ভয় তাদের সেবা গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। ফলে সমস্যা গুরুতর হয়ে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে জীবনবিধ্বংসী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
আত্মহত্যা বা সন্তানের ওপর সহিংসতা করতে পারে এমন ব্যক্তির আচরণ থেকে কিছু বিশেষ লক্ষণ বা সংকেত বোঝা যায়। এসব সংকেত শনাক্ত করে সময়মতো ব্যবস্থা নিলে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা সম্ভব।
১. নিজেকে বোঝা মনে করা: নিজের বা সন্তানের জীবনের কোনো মূল্য নেই বলে ভাবা এবং নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা।
২. সম্পর্ক ছিন্ন করা: বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া এবং একাকীত্ব বেছে নেওয়া।
৩. নিজের সম্পদ বিলিয়ে দেওয়া: আর্থিক ও ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গুছিয়ে ফেলা এবং জিনিসপত্র অন্যদের দিয়ে দেওয়া।
৪. মৃত্যু নিয়ে কথা বলা: মৃত্যুকে একমাত্র সমাধান বা মুক্তি মনে করা এবং এমন ভাব প্রকাশ করা।
৫. আচরণগত পরিবর্তন: আচরণে অস্বাভাবিক শান্তভাব বা বিপরীতমুখী কর্মকাণ্ড দেখা দেওয়া।
এ ধরনের ঘটনার প্রতিরোধে প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা, সময়মতো উদ্যোগ এবং সামাজিক সহযোগিতা। নিচে কিছু পদক্ষেপ উল্লেখ করা হলো:
১. মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো খুবই জরুরি।
২. অভিভাবকদের জন্য সহযোগিতা: সন্তান লালন-পালন করতে গিয়ে অনেকেই আর্থিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়েন। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সহযোগিতা তাদের মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে।
৩. মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা: মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
৪. জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা: চিকিৎসার মতো মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রেও জরুরি সেবা থাকা জরুরি, যেখানে দ্রুত ও প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যাবে।
সন্তানসহ আত্মহত্যার ঘটনা মানসিক অসুস্থতার চরম পরিণতি। এসব প্রতিরোধে আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।