শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন
মানবজীবনের পবিত্র বন্ধন বিয়েকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। নারী-পুরুষের চরিত্র সংরক্ষণ ও পারিবারিক স্থিতি বজায় রাখতেই ইসলামে বিয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আর এই বিয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো দেনমোহর।
দেনমোহর নারীর একটি নির্ধারিত অধিকার। এটি শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে লিখে রাখার বিষয় নয়; বরং যথাযথভাবে পরিশোধ করা ইসলামের স্পষ্ট বিধান। ইসলামে দেনমোহরের মূল উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীকে সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রদান করা।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, যখন একজন পুরুষ স্ত্রীকে নিজের ঘরে নিয়ে আসেন, তখন তাকে সম্মানজনক উপহার বা সম্পদ প্রদান করা উচিত, যা তার মর্যাদাকে প্রকাশ করে। তবে দেনমোহর এত কম নির্ধারণ করা ঠিক নয়, যাতে সম্মানের কোনো প্রতিফলন না থাকে। আবার এত বেশি নির্ধারণ করাও অনুচিত, যা স্বামীর পক্ষে পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজে অনেক পরিবার মনে করে, উচ্চ অঙ্কের দেনমোহর নির্ধারণ করলে বৈবাহিক সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হবে। কিন্তু ইসলামে দেনমোহরের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ ঠেকানোর কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এটি পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধের প্রতীক।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
“তোমরা বিয়ে করো তোমাদের পছন্দের নারীদের থেকে, দুজন অথবা তিনজন অথবা চারজন; কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে তোমরা ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে পারবে না, তাহলে মাত্র একজন।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৩)
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে,
“আর মুমিন সচ্চরিত্রা নারী ও তোমাদের আগে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের সচ্চরিত্রা নারীদেরকে তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো, যদি তোমরা তাদের দেনমোহর প্রদান করো।” (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৫)
ইসলামে দেনমোহরের কোনো নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। প্রত্যেক ব্যক্তি তার আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারণ করতে পারবেন।
মহান আল্লাহ বলেন,
“বিত্তবান ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার রিজিক সীমিত, সে আল্লাহ যা দিয়েছেন তা থেকেই ব্যয় করবে।” (সুরা তালাক, আয়াত: ৭)
তবে দেনমোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা যেমন বিবেচনায় রাখতে হবে, তেমনি স্বামীর আর্থিক সক্ষমতার প্রতিও লক্ষ্য রাখা জরুরি। অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত দেনমোহর ধার্য করা ইসলামি শরিয়তের ভারসাম্যপূর্ণ নীতির পরিপন্থি।
ইসলামে দেনমোহরের সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারিত রয়েছে। শরিয়ত অনুযায়ী, সর্বনিম্ন দেনমোহর হলো ১০ দিরহাম, যা প্রায় ৩০.৬১৮ গ্রাম রুপার সমপরিমাণ। এর কমে দেনমোহর নির্ধারণ করলে স্ত্রী সম্মতি দিলেও তা বৈধ হবে না।
নবীজি সাল্লাহল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“১০ দিরহামের কম কোনো দেনমোহর নেই।” (বায়হাকি শরীফ, ৭/২৪০)
বর্তমান বাজারে রুপার দামের সঙ্গে মিলিয়ে দেনমোহরের সর্বনিম্ন মূল্য হিসাব করা হয়।
দেনমোহর শুধু নগদ অর্থ বা রুপা দিয়েই আদায় করতে হবে— এমন বাধ্যবাধকতা নেই। স্ত্রী চাইলে গয়না, জমি, গাড়ি, বাড়ি বা অন্য মূল্যবান সম্পদও দেনমোহর হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।
তবে স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া কোনো কিছু দেনমোহর হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। যদি স্ত্রী কোনো উপহার গ্রহণ করতে না চান, তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার তার রয়েছে। (আহসানুল ফাতাওয়া : ৫/২৮)
হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বিয়ের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দেনমোহর নির্ধারণ করেছিলেন, তাকে “মোহরে ফাতেমি” বলা হয়। এর পরিমাণ ছিল ৫০০ দিরহাম, যা বর্তমান হিসাবে প্রায় ১.৫৩০৯ কিলোগ্রাম রুপার সমপরিমাণ।
তবে মোহরে ফাতেমি নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক নয়। স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারণ করাই ইসলামের শিক্ষা।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন,
“নারীদের মোহরানা নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। যদি এটি সম্মান বা তাকওয়ার বিষয় হতো, তাহলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-ই সবচেয়ে বেশি মোহর নির্ধারণ করতেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১১১৪)