শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ০৬:১৯ অপরাহ্ন
আধুনিক জীবনে স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া এখন দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছে। যোগাযোগের সুবিধা দিতে গিয়ে এই মাধ্যম ধীরে ধীরে অনেকের জন্য আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সময়ের অপচয়, মানসিক চাপ ও উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও বাড়ছে।
ইসলামে সময়কে মহান আল্লাহর দেওয়া মূল্যবান আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই ডিজিটাল আসক্তি থেকে বেরিয়ে এসে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গঠনের জন্য ইসলামে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটানো ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয়। প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে— এই অনুভূতি মানুষকে সচেতন রাখে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “কেয়ামতের দিন কোনো বান্দাই তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া এক কদমও এগোতে পারবে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)
সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন অনেক বিষয় থাকে, যা মানুষের দুনিয়া বা আখিরাত— কোনো ক্ষেত্রেই উপকারে আসে না। ইসলামে অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকাকে উত্তম চরিত্রের নিদর্শন বলা হয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হলো সে অনর্থক বিষয় পরিহার করবে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭)
অনলাইনে পাওয়া প্রতিটি সংবাদ বা পোস্ট শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। গুজব ছড়ানো বা যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার করা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন, “যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি তোমাদের কাছে সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)
ইন্টারনেটে অশালীন ছবি, ভিডিও বা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় অনুসরণ করা আত্মিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ইসলাম দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
আল্লাহ বলেন, “মুমিনদের বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।” (সুরা নুর, আয়াত: ৩০)
সোশ্যাল মিডিয়ায় কাউকে অপমান করা, ব্যঙ্গ করা বা কটূক্তি করা গুনাহের কাজ। ইসলাম গিবত ও অপমানকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
আল্লাহ বলেন, “তোমরা একে অপরের গিবত করো না।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)
নিজের ইবাদত, বিলাসিতা বা ব্যক্তিগত অর্জন প্রকাশ করে প্রশংসা পাওয়ার মানসিকতা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এটি রিয়া বা লোকদেখানো আমলের অন্তর্ভুক্ত।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “আমি তোমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি ভয় করি ছোট শিরককে, অর্থাৎ লোকদেখানো আমলকে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৮১)
অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের বাস্তবতা নিয়ে হতাশ হওয়া বা ঈর্ষান্বিত হওয়া মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে। ইসলাম হিংসা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “হিংসা মানুষের নেক আমলকে ধ্বংস করে দেয়।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯০৩)
দিনের নির্দিষ্ট সময়ে স্মার্টফোন থেকে দূরে থাকা মানসিক প্রশান্তি বাড়ায়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানুষকে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে আল্লাহর স্মরণে মনোযোগী করে।
আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
ভার্চুয়াল যোগাযোগে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক অবহেলিত হচ্ছে। ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও পরিবারকে সময় দেওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রিজিক বৃদ্ধি ও দীর্ঘ জীবন চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬)
সোশ্যাল মিডিয়া ইতিবাচক কাজের বড় মাধ্যমও হতে পারে। জ্ঞান, দাওয়াত ও উপকারী তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ভালো কাজের পথ দেখাবে, সে সেই কাজের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৯৩)
সবশেষে বলা যায়, স্মার্টফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া নিজে খারাপ নয়। বরং এর সঠিক বা ভুল ব্যবহারই মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। ইসলামের নির্দেশনা মেনে প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ডিজিটাল যুগেও ভারসাম্যপূর্ণ ও অর্থবহ জীবন গড়ে তোলা সম্ভব।