শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪৯ পূর্বাহ্ন
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো বেশ চ্যালেঞ্জিং। ‘সহজ পথ’ খুঁজতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী বিভ্রান্ত হন। তাই প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা দূর করা জরুরি।
অনেকেই মনে করেন, আইইএলটিএস বা টোয়েফলের স্কোর ছাড়াই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব। এটি পুরোপুরি মিথ্যা নয়, তবে উন্নত দেশগুলোতে—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, বা ইউরোপের দেশগুলো—ভর্তি বা ভিসার জন্য এই পরীক্ষার স্কোর অপরিহার্য। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা প্রমাণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ইউনিভার্সিটি অব আইওয়ার ফার্মাসি বিভাগের ডক্টরাল শিক্ষার্থী অতনু চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘ফেসবুক বা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে অনেকে বিভ্রান্ত হন। কিন্তু আইইএলটিএস বা টোয়েফল পরীক্ষার স্কোর শুধু ভর্তির জন্য নয়, ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। দূতাবাস বা ভিসা কর্তৃপক্ষ এসব পরীক্ষার স্কোর দেখে আবেদন মূল্যায়ন করে। ফলে, স্কোর ছাড়া উচ্চশিক্ষার সুযোগ খোঁজাটা অবাস্তব। কিছু প্রতিষ্ঠান স্কোর ছাড়াই সুযোগের কথা বললে তাদের এড়িয়ে চলাই ভালো।’
কিছু শিক্ষার্থী মনে করেন, কাগজপত্র বানিয়ে বা এজেন্সির ওপর নির্ভর করে সহজেই বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া যায়। এটি একটি বিপজ্জনক ভুল ধারণা। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহিদুল আলম বলেন, ‘এজেন্সির বিজ্ঞাপন দেখে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সময় ও অর্থ অপচয় হতে পারে। কোনো শর্টকাট পথ নেই। বিদেশে পড়তে চাইলে আগে থেকে পরিকল্পনা করা জরুরি। যেমন, আইইএলটিএস বা জিআরই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হয়। এজেন্সির ওপর নির্ভর করার চেয়ে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ঘেঁটে কিংবা ই–মেইল করে তথ্য জেনে নেওয়া ভালো। প্রস্তুতি ছাড়া বিদেশে গিয়ে দেখা যায় বাস্তবতা ভিন্ন। থাকার জায়গা, কাজের সুযোগ—সবকিছু নিয়েই সংকট তৈরি হয়। প্রথম কয়েক মাসের খরচ চালানোর মতো সঞ্চয় না থাকলে সমস্যায় পড়তে পারেন।’
এ ধারণাটি অনেকের বিপদ ডেকে আনে। বেশিরভাগ বৃত্তি বা ভিসার শর্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা শেষে নিজ দেশে ফিরতে হয়। কোর্স পরিবর্তন বা দেশান্তরিত হওয়ার সুযোগ সীমিত। ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের পিএইচডি শিক্ষার্থী রৌনক সাহা জানান, ‘দেশভেদে নিয়ম আলাদা। অনেক শিক্ষার্থী ছোট কোনো দেশে গিয়ে পরে অন্য দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এটি বাস্তবসম্মত নয়। ইউরোপ বা আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ম, শর্ত ও তথ্য তাদের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত দেওয়া থাকে। সেসব পড়ে সিদ্ধান্ত নিন। সাইপ্রাসের মতো কিছু দেশের ভর্তির অফার লেটার নিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা অনেক সময় প্রতারিত হন। তাই যথাযথ গবেষণা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।’
বৃত্তি পাওয়ার অর্থ এই নয় যে আর কোনো খরচ লাগবে না। বেশিরভাগ বৃত্তি শুধু টিউশন ফি কভার করে। গবেষণাধর্মী কোর্সের জন্য কিছু বৃত্তি সহায়ক হলেও থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য খরচ শিক্ষার্থীকেই বহন করতে হয়। রৌনক বলেন, ‘বৃত্তির বাইরে অর্থ প্রয়োজন হবে। অনেক দেশে পার্টটাইম কাজ করেও খরচ মেটানো কঠিন। দেশের নিয়ম-কানুন বুঝে প্রস্তুতি নিতে হবে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাম্পাসের বাইরে কাজের সুযোগ কম, অথচ অস্ট্রেলিয়ায় তা কিছুটা বেশি। ইউরোপে স্থানীয় ভাষা না জানলে চাকরি বা কাজের সুযোগ প্রায় থাকে না। তাই শুধু একটি অফার লেটার পেয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার আগে ভালোভাবে তথ্য সংগ্রহ করুন।’
অনেকেই মনে করেন, বিদেশে পড়াশোনা করলেই নাগরিকত্ব বা স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। এটি একটি ভুল ধারণা। সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জি এম মাজিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রত্যেক দেশের নিয়ম ভিন্ন এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া কঠোর। চাকরির ক্ষেত্রেও অনেক নিয়ম মানতে হয়। আইন ভাঙলে জরিমানা বা জটিলতার মুখে পড়তে পারেন। পরিবেশ, আবহাওয়া, এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য মানিয়ে নেওয়াও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’ যুক্তরাজ্যের কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী আনিকা তাবাসসুম বলেন, ‘বিদেশের আবহাওয়া এবং কাজের পরিবেশ ভিন্ন। প্রস্তুতি ছাড়া অনেক শিক্ষার্থী নানা জটিলতায় পড়েন। পরিবারের সদস্য নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও চিন্তা-ভাবনা করে করা উচিত।’
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য সঠিক তথ্য ও প্রস্তুতি অপরিহার্য। শর্টকাট খুঁজতে গিয়ে ভুল পথে পা দিলে সময়, অর্থ এবং স্বপ্ন নষ্ট হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখার মাধ্যমেই সফল হওয়া সম্ভব।