বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১৯ অপরাহ্ন
বিদ্রোহ আর প্রেমে রাঙা নজরুল সন্ধ্যায় কাঁপলো রাণীশংকৈল!
ইন্তাজুল ইসলাম এনতাজ – ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল যেন এক সন্ধ্যায় রঙে, সুরে আর বিদ্রোহে ভেসে গেল—কারণ সেখানে পালিত হলো সাম্যের কবি, বিদ্রোহের দীপ্ত নাম, কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মজয়ন্তী। “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”—এই চিরন্তন মানবতাবাদী প্রতিপাদ্য সামনে রেখে রোববার (২৫ মে) সন্ধ্যায় রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজ হলরুমে আয়োজন করা হয় এক অনবদ্য সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সন্ধ্যা, যার পুরো কৃতিত্ব ষড়জ শিল্পীগোষ্ঠীর নিষ্ঠা ও হৃদয়বান আয়োজনকে।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ-রাণীশংকৈল) আসনের জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মাটি ও মানুষের নেতা, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদ। এই উপস্থিতি কেবল অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক গৌরবে ভাসিয়ে দেয়নি, বরং নজরুলচেতনার বিস্তারে এক ঐক্যমতের পরিবেশও তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ষড়জ শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি রেজাউল ইসলাম বাবু। কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য ও বিপ্লবী চেতনার বিশ্লেষণ নিয়ে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন নজরুল বিশেষজ্ঞ ও বীরগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মাসুদুল হক। তার ভাষায়, “নজরুল শুধু কবি নন, তিনি এক বিপ্লব, এক সাম্যবাদী মানবচেতনার ছায়াবৃক্ষ—যার নিচে দাঁড়িয়ে আজও আমরা সাহস খুঁজি।”
মঞ্চে আলো ছড়িয়েছেন আরও অনেকে। বিশেষ সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, সাহিত্য বিশ্লেষক ড. তারেক রেজা। তিনি নজরুলের রচনার পলিটিক্যাল ও প্যাশনেট দিকটি তুলে ধরেন, বলেন, “নজরুল প্রেম মানে দ্রোহ, তার সংগীত মানে অভ্যুত্থান।”
লোকসংগীত বিষয়ক গবেষক সৈয়দ জাহিদ হাসান নজরুল সংগীতের ভেতর লুকিয়ে থাকা লোকজ আবেগ ও সংগ্রামী আত্মার খোঁজ দেন তার বক্তব্যে।
আরও উপস্থিত ছিলেন রানীশংকৈল উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ, তিনবারের সফল ভাইস-চেয়ারম্যান ও জামায়াতের নায়েবে আমির মিজানুর রহমান, পৌর বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক শাহজাহান আলী, যারা তাঁদের বক্তব্যে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা এবং সমকালীন সমাজে তাঁর দর্শনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
আলোচনার পর সন্ধ্যার আবেশ আরও গভীর হয়ে ওঠে সংগীত ও কবিতার স্পন্দনে। স্থানীয় ও অতিথি শিল্পীদের পরিবেশনায় নজরুল সংগীত ও কবিতা আবৃত্তির পর্ব মঞ্চে যেন বয়ে আনে দ্রোহের আগুন আর প্রেমের পরশ। গানে, কবিতায় ফুটে ওঠে ‘বিদ্রোহী’র জ্বালা, ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’-এর ডাক, ‘চল চল চল’-এর ছন্দময় যাত্রা।
অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল এক উষ্ণ, সাংস্কৃতিক সৌহার্দ্য। ষড়জ শিল্পীগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করা হয়, শিল্পী ও বক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা স্মারক। এমন সংবর্ধনার আবহে স্পষ্ট হয় নজরুল-ভক্তদের অন্তরের শ্রদ্ধা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিদ্রোহী কবির চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার দায়বোধ।
এই আয়োজন যেন শুধু এক কবির জন্মদিন উদযাপন নয়—এ এক প্রতিবাদ, এ এক প্রেম, এ এক প্রতিজ্ঞা—নজরুলের আদর্শকে বুকে ধারণ করে অসাম্য আর অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর জাগিয়ে তোলার প্রয়াস।