বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩৯ অপরাহ্ন
ভদ্রাবতীর বুক চিড়ে ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে নীরবে!
অনলাইন ডেস্ক
বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী নদীগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের পাতা থেকে। হারিয়ে যাচ্ছে ভদ্রা ও ভাদাই নদীর স্বকীয়তা, আর ভদ্রাবতী নদী যেন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছে। এক সময়ের খরস্রোতা এই নদীগুলো এখন বিষাক্ত কালো পানির ভারে নুয়ে পড়া মৃতপ্রায় জলধারা। শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্যে নদীর জল রূপ নিয়েছে বিষে, ফলে হারিয়ে গেছে জীববৈচিত্র্য ও মাছের ঝাঁক।
এক সময়ে পাল তোলা নৌকার ছায়া পড়ত এই নদীগুলোর জলে, মেলে ধরত প্রাণের উৎসব। কৃষিজমির সেচ ব্যবস্থা পুরোপুরি নির্ভর করত এই নদীগুলোর পানির ওপর। কিন্তু পলি জমে নদীগুলোর বুকে, আর নিয়মিত খননের অভাবে আজ সেগুলো পরিণত হয়েছে শুষ্ক মরা খালে। সময়ের সঙ্গে ভদ্রাবতী নদী এখন যেন শুধুই বিষাক্ত ময়লা বয়ে নিয়ে যাওয়া এক নর্দমা। এই দূষণ শুধু মাছ নয়, ক্ষতি করছে আশেপাশের কৃষিজমিও।
ভদ্রাবতী নদীর উৎপত্তি শাজাহানপুর উপজেলার শবরুল দিঘী থেকে, যা পরে গিয়ে মিলেছে ভাদাই নদীতে। করতোয়া নদী থেকে উৎস পেয়ে ভদ্রাবতী ছিল এক সময় বাণিজ্যের প্রাণ। গড়ে উঠেছিল বন্দর, গড়ে উঠেছিল জনপদ। দেশ স্বাধীনের পর করতোয়ার সঙ্গে পুনঃসংযোগ ঘটলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে নদী তার প্রাণ হারাতে বসেছে।
বর্তমানে এই নদীর দৈর্ঘ্য ১৬ কিলোমিটার, কিন্তু পানি নেই বললেই চলে। অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাড় দখলের প্রতিযোগিতায় হারাতে বসেছে নদী তার নদীত্ব।
শাবরুলের প্রবীণ বাসিন্দা আমজাদ হোসেন জানান, তার দাদার কাছ থেকে শোনা কাহিনি অনুযায়ী, সেন বংশের শেষ রাজা অচ্যিন কুমারের কন্যা ভদ্রাবতীর নামেই নদীটির নামকরণ। অতীতে বর্ষায় নদীর পানিতে ভাসত গ্রাম, মিলত দেশীয় মাছের ছড়াছড়ি। সেসব দৃশ্য আজ শুধুই স্মৃতি।
নদী বাঁচাতে হলে বন্ধ করতে হবে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, বন্ধ করতে হবে দূষণের কালো ধারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, তিনটি নদী—ভদ্রাবতী, ভাদাই ও ভদ্রা পুনঃখননের জন্য প্রায় ২২ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভদ্রাবতীর জন্য ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বরাদ্দ, বাকি ১৬ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকবে ভাদাই ও ভদ্রা নদীর জন্য। মোট ৪১ কিলোমিটার নদী পুনঃখননের আওতায় আনা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পওর উপ-বিভাগ-১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মাদ আছাদুল হক জানান, প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অনুমোদন পেলে নদীগুলো ফিরে পাবে নতুন জীবন।
শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হক শাহীন বলেন, “সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই নদীগুলো পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে ফেরানো সম্ভব তাদের হারানো ঐতিহ্য। নদী মাত্রিক বাংলাদেশে এই উদ্যোগ সময়ের দাবি।”
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল হক জানিয়েছেন, করতোয়া নদী পুনঃখননসহ জেলার অন্যান্য নদী নিয়েও কাজ চলছে। ভদ্রাবতী, ভাদাই ও ভদ্রা নদীও এই উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।
এই তিন নদী কেবল জলপথ নয়, তারা ইতিহাসের ধারক, জীবনের বাহক। তাদের বাঁচাতে উদ্যোগ হতে হবে আন্তরিক, আর বাস্তবায়ন হতে হবে দ্রুত।