শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন
গভীর রাত পর্যন্ত চলা নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বানে আয়োজিত ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার বিচার এবং আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি তোলা হয়েছে। লাখো ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে ‘মুজিববাদ ধ্বংস হোক, বিপ্লব জিন্দাবাদ’সহ নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা। বক্তারা জানান, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলের অবসানের জন্য এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। একইসঙ্গে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র প্রকাশের দাবি জানানো হয়। বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডসহ অতীতে ঘটে যাওয়া গুম-খুনের বিচারের দাবি তুলে ধরতে হবে।
এই কর্মসূচি মূলত ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের লক্ষ্যে ডাকা হয়েছিল। তবে ৩০ ডিসেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং পেশাজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে। এরপর ছাত্ররা কর্মসূচির নাম পরিবর্তন করে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ হিসেবে আয়োজন করেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজারো মানুষের সমাবেশে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সকালের দিকে উপস্থিতি কম থাকলেও দুপুরের পর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দেশের জেলা ও বিভাগ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও জনতা কর্মসূচিতে অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের কেউ মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধেছেন, কেউ হাতে জাতীয় পতাকা এবং ফিলিস্তিনের পতাকা বহন করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিলকারীদের দেখা যায়। সেসময় শহীদ মিনার ও তার আশপাশে ‘আবু সাইদ-মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’, ‘স্বৈরাচারের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’, ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘খুনি হাসিনার ফাঁসি চাই’, ‘মুজিববাদ ধ্বংস হোক’, ‘গোলামি না, স্বাধীনতা চাই’সহ নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে বলেন, শহীদদের রক্তের দাগ এখনও শুকায়নি, অথচ স্বৈরাচারী শাসকদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। যখনই ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশ গঠনের চেষ্টা করা হয়, তখনই কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিরোধিতায় নেমে পড়ে। প্রয়োজনে তাদেরও প্রতিরোধ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নেতাকর্মীরা সকাল থেকেই শহীদ মিনারের আশপাশে অবস্থান নেন। অনেকে শহীদ মিনারের সামনের চত্বরে চেয়ার পেতে বসে থাকেন। শহীদ পরিবারের সদস্যরাও শহীদ মিনারে এসে তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। এক পর্যায়ে তারা মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে উপস্থিত হন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের জুলাই অভ্যুত্থানের জন্য এখনও কোনো ঘোষণাপত্র নেই। আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করতে হবে।’ তিনি আরও জানান, ঘোষণাপত্রের জন্য জনগণের মতামত নিতে প্রতিটি জেলা ও মহল্লায় যাওয়া হবে। এছাড়া ফ্যাসিবাদ এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি।
জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, ‘ছাত্র-জনতার দাবির মুখে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি আমাদের বিজয়। এই ঘোষণাপত্রে মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণআন্দোলন এবং বর্তমান সময়ের জনগণের আকাঙ্ক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম জানান, ‘বিদেশে পালিয়ে থাকা খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে হবে। গোপালগঞ্জে লুকিয়ে থাকা তাদের সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।’ নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশের মাধ্যমে দেশের নতুন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।’
কর্মসূচিতে উপস্থিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, ‘গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের বিচার না হওয়া পর্যন্ত দেশে কোনো নির্বাচন হবে না।’ জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্ত শারমিন বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্রের জন্য ১৫ জানুয়ারির সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।’
কর্মসূচির সূচনায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ শাহরিয়ার হাসান আলভীর বাবা আবুল হাসান, পুলিশের গুলিতে আহত খোকন চন্দ্র বর্মণ, এবং আতিকুল গাজীসহ শহীদ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন। শহীদ মীর মুগ্ধের বাবা সকল শহীদ ও আহতদের ‘বিপ্লবী যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানান। এছাড়াও বিভিন্ন ছাত্রনেতা এবং সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে বক্তব্য প্রদান করা হয়।