রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন
বিদ্রোহ থেকে আদালত—চিরনিদ্রায় গেলেন এক ইতিহাসের কারিগর।
অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশের বিচার অঙ্গন ও রাজনীতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে—মৃত্যুবরণ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শামসুল হুদা মানিক। বার্ধক্যজনিত কারণে গতকাল রোববার (২৫ মে) রাত সাড়ে ১১টায় রাজধানীর ইব্রাহীম মেমোরিয়াল কার্ডিয়াক হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন প্রবীণ এই ব্যক্তিত্ব। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। রেখে গেছেন দুই কন্যা, এক পুত্র, এবং দেশের আইন-রাজনীতিতে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য গুণগ্রাহী ও অনুরাগী।
শুধু বিচারপতি হিসেবেই নয়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন একজন সাহসী সংগঠক। যুদ্ধকালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনি গোপালগঞ্জ অঞ্চলে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে। তাঁর জীবনের রাজনীতিগত পথচলা শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ থেকে। আশির দশকে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন, হয়ে ওঠেন দলীয় সিদ্ধান্ত ও স্থানীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর।
পরবর্তীতে তাঁকে গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়, যেখানে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হয় একাধিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তিনি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। সেখানে তাঁর আইনজ্ঞতাসম্পন্ন রায় ও ন্যায়ভিত্তিক অবস্থান বিচারপতি হিসেবে তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়।
পরবর্তীতে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালত—আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখান থেকে অবসরের পরেও থেমে থাকেননি। তাঁকে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যেখানে তিনি শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের জটিলতা নিরসনে সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এতো কীর্তির পরেও তাঁর বিদায় ছিল বিনম্র। সোমবার (২৬ মে) দুপুরে বাদ জোহর গোপালগঞ্জ কোর্ট মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, বিচার অঙ্গনের সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও সাধারণ মানুষ। পরে তাঁর গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়া উপজেলার গিমাডাঙ্গা রাবেয়া খাতুন হাফেজিয়া মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জানাজা। সেখান থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে—যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন এক নির্ভীক সংগঠক, একজন সম্মানিত বিচারপতি এবং এক জীবন্ত ইতিহাস।
বিচারপতি শামসুল হুদা মানিকের মৃত্যুতে জাতি হারালো এক নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিক, যিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আইন এবং ন্যায়ের আদর্শে জীবন কাটিয়ে গেছেন নিঃসঙ্গ অহঙ্কারহীনতার সঙ্গে। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি শক্ত হাতে আইন ও আদর্শকে ধারণ করে দেশের ইতিহাসে তাঁর নাম খোদাই করে গেছেন নীরবে, দৃপ্তভাবে।