রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন
রাতের আঁধারে সীমান্ত পেরিয়ে এলো ১৯ জন!
কেফায়েত উল্লাহ – খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা সীমান্তে ফের ঘটলো আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক পুশইন ঘটনা। সোমবার ভোররাতে আচালং সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ—তাও একে-বারে ১৯ জন নারী, পুরুষ ও শিশুদের একসঙ্গে। একে নিছক একটি সীমান্তীয় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বললে ভুল হবে, কারণ এটি চলতি মে মাসে ঘটে যাওয়া পুশইনের ধারাবাহিকতায় আরেকটি বড় মাইলফলক হয়ে রইল।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ভারতীয় হরিয়ানা রাজ্য থেকে আটক করে এনে এ ১৯ জনকে খাগড়াছড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ। যাদের পুশইন করা হয়েছে, তারা সবাই বাংলা ভাষাভাষী। এদের মধ্যে শিশু থেকে শুরু করে নারী ও পুরুষ রয়েছেন, যাদের কাহিনি এখনও অস্পষ্ট, পরিচয় রহস্যে মোড়া।
বর্তমানে তারা অবস্থান করছেন মাটিরাঙ্গার কৃষ্ণ দয়াল সীমান্ত ফাঁড়ির আওতাধীন ডিবি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যা সাময়িকভাবে রূপ নিয়েছে নিরাপত্তা হেফাজতের ঘাঁটিতে। তাদের দেখভাল করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৪৩ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুরুল আলম জানিয়েছেন, “পুশইন হওয়া ব্যক্তিরা বর্তমানে বিজিবির হেফাজতে রয়েছে। আমরা তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই করছি।” তবে তাদের মুখে এখনো অস্পষ্ট আতঙ্ক—নিরাপত্তাহীনতার ছাপ স্পষ্ট।
এদিকে, জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার বললেন, “তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তারা যদি প্রকৃত বাংলাদেশি হন, তবে তাদের নিজ নিজ জেলায় পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” প্রশাসন এখন সরব, তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই মানুষগুলো আদতে কারা?
মে মাসের শুরু থেকে খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে একাধিকবার ভারত থেকে বাংলাদেশে বাংলা ভাষাভাষী নাগরিকদের পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবারই তা ঘটছে গভীর রাতে কিংবা ভোরবেলায়, যখন চারদিক ঘুমন্ত—আর সজাগ থাকে শুধু সীমান্তের দুই প্রান্তে দাঁড়ানো সশস্ত্র বাহিনী।
এই ঘটনাগুলো সামনে এনে দিচ্ছে এক গভীর উদ্বেগ—বাংলাদেশে এইভাবে একতরফাভাবে মানুষ পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়টি কি আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক সম্পর্ক আর মানবাধিকারের নিরিখে কোনো উত্তর দাবি করে না? কারা এই পুশইনের শিকার, তারা কি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, নাকি পিতা-মাতার জন্ম বাংলাদেশে হওয়ায় নাগরিকত্বের দাবিদার? বিএসএফ কীভাবে তাদের পরিচয় নির্ধারণ করল, এবং এতদূর হরিয়ানার মতো রাজ্য থেকে এনে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল?
এই ঘটনার গভীরে যেতে হলে শুধু প্রশাসনিক বিবৃতি নয়, প্রয়োজন মানবিক অনুসন্ধান, প্রয়োজন আন্তঃদেশীয় আলোচনার স্বচ্ছতা। কারণ সীমান্তে দড়ির দুই প্রান্তে যে মানুষের গল্প—তা রাজনীতি আর ভূগোলের কল্পনায় নয়, বাস্তবের কান্নায় লেখা।