রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৮:২৫ পূর্বাহ্ন
সবুজ বনভূমি কেটে, সমুদ্রকে ঘোলা করে তৈরি হচ্ছে বৈদ্যুতিক স্বপ্ন
অনলাইন ডেস্ক
বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু এর পেছনে যে রক্তাক্ত পরিবেশের গল্প লুকিয়ে আছে, তা কি জানেন? ইন্দোনেশিয়ার রাজা আম্পাত—এই স্বর্গীয় দ্বীপপুঞ্জ এখন পৃথিবীর অন্যতম সামুদ্রিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর রাজা আম্পাত, যাকে “সমুদ্রের অ্যামাজন” বলে ডাকা হয়, এখন রঙ হারাচ্ছে। প্রবালপ্রাচীর, মাছ, সামুদ্রিক প্রাণী—সব হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আর এই ধ্বংসের নায়ক হচ্ছে নিকেল, যা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ও স্টেইনলেস স্টিল তৈরির জন্য অপরিহার্য।
রাজা আম্পাতের কাওয়েই দ্বীপে খনিজ উত্তোলনের যে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা রীতিমতো এক পরিবেশগত দুর্যোগ। সবুজ বন কেটে তৈরি করা হচ্ছে কাদা রাস্তা, বিশাল গর্ত আর পুকুরে জমে থাকা লালচে পানি যেন একেকটি মৃত্যুকূপ। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শুধু মাটি কাটার জন্য বনভূমি দখল বেড়েছে প্রায় ৫০০ হেক্টর, যা ৭০০টি ফুটবল মাঠের সমান!
আকাশ থেকে তোলা ছবিগুলো আরও ভয়াবহ। গাঢ় নীল সাগরের পানির রং বদলে এখন তা বাদামি ও ঘোলা। এতে পলিমাটি প্রবাহিত হয়ে গিয়ে ক্ষতি করছে প্রবালপ্রাচীর, যার ফলে রাজা আম্পাতের অনন্য জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে।
এমন পরিস্থিতিতে ইন্দোনেশীয় সরকার যদিও পাঁচটি খনির মধ্যে চারটির অনুমতি বাতিল করেছে, কিন্তু খনন এখনো থেমে নেই। গ্যাগ দ্বীপে খনিজ উত্তোলন চলছেই। মার্ক এর্ডম্যান, এক পরিবেশ বিজ্ঞানী বলেন, ‘‘এই অঞ্চল শুধুমাত্র ইন্দোনেশিয়ার সম্পদ নয়, এটি বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঠিক পথে, কিন্তু এখনও অনেক কাজ বাকি।’’
এদিকে গ্লোবাল উইটনেস ও ফরেস্ট ওয়াচ ইন্দোনেশিয়ার তথ্য বলছে, খনিজ উত্তোলনের ফলে এখানকার বনভূমি ধ্বংস হয়ে কৃষিজমি হারাচ্ছে। বৃষ্টি হলে পাহাড়ি মাটি ধসে সাগরে গিয়ে মেশে। ফলে স্থানীয়ভাবে বন্যা ও ভূমিধসের সংখ্যা বেড়েছে।
বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি নিকেল এখন ইন্দোনেশিয়া থেকে আসে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার দাপিয়ে বেড়াতে থাকা বড় বড় কোম্পানিগুলোও এখানে বিনিয়োগ করছে। ফলে খনিজ উত্তোলনের মাত্রা বেড়ে চলছে আশঙ্কাজনক হারে।
জাকার্তার পরিবেশ সংগঠন জতাম-এর কর্মী ইমাম শোফওয়ান বলেন, ‘‘বৈদ্যুতিক গাড়ির কথা শুনলেই অনেকে মনে করেন, আমরা পরিবেশ রক্ষা করছি। কিন্তু এর জন্য যে বন ধ্বংস হচ্ছে, কৃষিজমি হারাচ্ছে, তা কেউ দেখে না। এই পরিবেশদ্রোহী উন্নয়ন মডেল থামাতে হবে।’’
রাজা আম্পাতের ভবিষ্যৎ আজ চরম অনিশ্চয়তায়। এই দ্বীপপুঞ্জে পরিবেশ সংরক্ষণের বদলে অর্থনৈতিক স্বার্থের জোয়ার বইছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য ‘সবুজ’ জগৎ গড়ার প্রচেষ্টা কতটা ধ্বংস ডেকে আনছে, তা বোঝার সময় এখনই।
এই বিশ্ব ঐতিহ্য শুধু ইন্দোনেশিয়ার নয়, আমাদের সবার। যতদিন না “সবুজ” উন্নয়ন প্রকৃত সবুজ হয়ে ওঠে, ততদিন রাজা আম্পাতের মত অসংখ্য স্বর্গীয় দ্বীপ হারিয়ে যাবে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে। এই একুশ শতকের উন্নয়নের নামে আমরা কি সত্যিই টিকিয়ে রাখতে পারব প্রকৃতিকে?