রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৮:২৫ পূর্বাহ্ন
৫ কোটি ৭০ লাখ বছর আগের দৈত্যাকার এক পাখির গল্প—যার ওজন ছিল একজন সিংহের সমান
অনলাইন ডেস্ক
এটা কোনো সিনেমার কল্পনা নয়, বরং বাস্তব জীবাশ্মের গল্প। নিউজিল্যান্ডে সম্প্রতি খুঁজে পাওয়া এক পেঙ্গুইনের জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে। নাম ‘কুমিমানু ফোর্ডাইসি’, যার অর্থ মাওরি ভাষায় দানব পাখি! এই পেঙ্গুইনের ওজন ছিল প্রায় ৩৫০ পাউন্ড, যা আধুনিক একটি সিংহের কাছাকাছি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় এবং পুরোনো পেঙ্গুইন প্রজাতিগুলোর একটি—যা প্যালিওসিন যুগের।
জার্নাল অব প্যালিওন্টোলজিতে প্রকাশিত এই গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, কুমিমানু ফোর্ডাইসি প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে নিউজিল্যান্ডের উপকূলে বিচরণ করত। এই দৈত্যাকার পাখিটি আকারে আধুনিক এম্পেরর পেঙ্গুইনের দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি পাখির বিবর্তনের ইতিহাসে এক নতুন মোড়।
নিউজিল্যান্ডের উত্তর ওটাগো উপকূলের প্রাচীন পাথরের স্তর থেকে জীবাশ্মটি খুঁজে পান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও তে পাপা জাদুঘরের গবেষক দল। ড্যানিয়েল ফিল্ড ও অ্যালান টেনিসনের নেতৃত্বে জীবাশ্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই পেঙ্গুইন ছিল একটি সুদূর অতীতের সামুদ্রিক দৈত্য—যা তার বিশাল দেহের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে ডুবে শিকার করত এবং ঠান্ডা জলবায়ুতে আরামদায়কভাবে বেঁচে থাকতে পারত।
এই পেঙ্গুইনের বিশাল ওজন এবং উচ্চতা শুধু চোখ ধাঁধানো নয়, এর শিকারক্ষমতাও ছিল বিশাল। গবেষকদের মতে, কুমিমানু ফোর্ডাইসি ডুব দিয়ে অনেক গভীরে যেতে পারত, যেখানে সাধারণ পাখিরা যেতে পারত না। এটি বড় মাছ, স্কুইড এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী শিকার করত। তাছাড়া এর বিশাল শরীর শীতল পানিতে তাপ ধরে রাখত খুব দক্ষতার সঙ্গে।
এমন দৈত্যাকার পেঙ্গুইন কেবল নিউজিল্যান্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না। গবেষকরা মনে করছেন, এই প্রজাতির পেঙ্গুইন দক্ষিণ আমেরিকা ও অ্যান্টার্কটিকাতেও ছড়িয়ে ছিল। লাখ লাখ বছর ধরে এসব এলাকা জুড়ে তারা রাজত্ব করেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারেনি, এবং প্রায় দুই কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, শুরুতে বড় আকার ছিল এদের পক্ষে সুবিধাজনক। গভীর সমুদ্রে ডুব, শিকার, এবং ঠান্ডা সহ্য করার জন্য দেহের এই গঠন ছিল আদর্শ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রে ডলফিন ও সিলের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আবির্ভাব হয়, যারা আরও দক্ষ শিকারি। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে কুমিমানুর মতো পেঙ্গুইনরা হারিয়ে যায় প্রকৃতির বিশাল পরিবর্তনের ঢেউয়ে।
কুমিমানু ফোর্ডাইসি শুধু একটি জীবাশ্ম নয়, এটি আমাদের পাখির বিবর্তন এবং প্রাচীন জীববৈচিত্র্যের এক মহামূল্যবান সূত্র। এটি প্রমাণ করে, পাখিরা একসময় স্থলে-জলে বিচরণকারী ভয়ংকর প্রাণীতে রূপ নিয়েছিল। তাদের অস্তিত্বের গল্প শুধু মাটির নিচে চাপা পড়ে নেই, বরং জীবাশ্ম হয়ে বলে যায় হাজারো বছর আগের এক বিস্ময়কর পৃথিবীর গল্প।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া