রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৯:০৭ পূর্বাহ্ন
মানুষের আগে মহাকাশে পা রেখেছিল কুকুর, বানর আর মাকড়সা—অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্য
অনলাইন ডেস্ক
মহাকাশে মানুষ পাঠানোর আগে বিজ্ঞানীরা একগুচ্ছ অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন: ভিন্ন গ্রহের পরিবেশে প্রাণী বাঁচতে পারে কি না? মাধ্যাকর্ষণহীন অবস্থায় শরীর কেমন আচরণ করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে মানুষ নয়, আগে পাঠানো হয়েছিল—কুকুর, বানর, কাঠবিড়ালি, কাছিম এমনকি মাকড়সাও!
এই রোমাঞ্চকর কাহিনির শুরু হয় ১৯৪০-এর দশকে, আর এখনকার আধুনিক স্পেস মিশনের মূলে রয়েছে সেসব নিরীহ প্রাণীর অবদান। চলুন জেনে নিই, মানুষের আগে মহাকাশজয় করা সেই সাহসী প্রাণীগুলোর গল্প।
১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম চেষ্টা করে এক বানরকে মহাকাশে পাঠানোর। আলবার্ট-২ নামের একটি রিসাস ম্যাকাক প্রজাতির বানর রকেটে চেপে পৌঁছেছিল ৮৩ মাইল উচ্চতায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে উড্ডয়নের সময়ই প্রাণ হারায় সে। এটি ছিল প্রাণীর প্রথম সফল মহাকাশ যাত্রা প্রচেষ্টা, যদিও জীবন রক্ষা করা যায়নি।
১৯৫৭ সালে ইতিহাস গড়েন লাইকা—একটি রাশিয়ান কুকুর। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে পাঠিয়েছিল স্পুটনিক-২ রকেটে করে। পৃথিবীকে ঘিরে মহাকাশে ভেসে থাকা প্রথম জীব ছিল লাইকা, কিন্তু দুঃখজনকভাবে সে ফিরতে পারেনি। তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ না করায় লাইকা মারা যায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। সে-ই হয়ে ওঠে মহাকাশের প্রথম শহীদ!
১৯৫৮ সালে পাঠানো হয় গর্ডো নামের এক দুষ্টু কাঠবিড়ালি। রকেটের মাধ্যমে সে ৬০০ মাইল উচ্চতায় যায় এবং মহাকাশে প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু ফেরার সময় ফ্লোটেশন ডিভাইস কাজ না করায় সে মহাকাশেই হারিয়ে যায়। গর্ডোর গল্প আজও হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
১৯৬০ সালে পাঠানো হয় আরও দুটি কুকুর—বেলকা ও স্ট্রেলকা। তারা মহাকাশে পৃথিবীকে একাধিকবার প্রদক্ষিণ করে এবং সফলভাবে জীবিত অবস্থায় ফিরে আসে। এটাই ছিল প্রথমবারের মতো কোনো প্রাণীর মহাকাশে গিয়ে বেঁচে ফেরা। এমনকি স্ট্রেলকার বাচ্চাদের একজন পরবর্তীতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে উপহারও দেওয়া হয়েছিল!
১৯৬১ সালে হ্যাম নামের একটি শিম্পাঞ্জি মার্কারি রকেটে মহাকাশে যায়। ওজনহীন অবস্থায় সে প্রায় ৬.৫ মিনিট কাটায়। যাত্রার সময় কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলেও হ্যাম সফলভাবে ফিরে আসে।
১৯৬২ সালে এনোস নামের আরেক শিম্পাঞ্জি সফলভাবে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ফেরে। তারা দেখিয়ে দেয় মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীও মহাকাশের চ্যালেঞ্জ নিতে পারে।
১৯৬৮ সালে পাঠানো হয় কাছিম, মাছি ও পোকা—চাঁদকে প্রদক্ষিণের উদ্দেশ্যে। বাকি প্রাণীরা হারালেও কাছিমগুলো নিরাপদে ফিরে আসে, যা ছিল চাঁদঘেরা অভিযানের প্রথম সফলতা।
১৯৭৩ সালে পাঠানো হয় দুটি মাকড়সা, যাদের মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে জাল বোনার ধরন পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা দেখতে পান, মাকড়সার জাল মহাকাশে একেবারেই ভিন্ন আকারে তৈরি হয়।
একসময় ব্যাঙকেও চাঁদের দিকে পাঠানো হয়েছিল—১৯৭০ সালে। যদিও বেশি কিছু জানা যায়নি সে মিশনের ফলাফল সম্পর্কে।
মানুষের মহাকাশ জয় যে আজ বাস্তবতা, তার পেছনে রয়েছে এই সাহসী প্রাণীদের নিঃশব্দ অবদান। লাইকা, হ্যাম, এনোস কিংবা বেলকার মতো প্রাণীরা আজ আমাদের মহাকাশ গবেষণার মাইলফলক।
তাদের কথা না বললে মহাকাশের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। তারা যেন সেই নিরব যোদ্ধা—যারা মানুষের জন্য রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিল নক্ষত্রে পৌঁছানোর।