শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:৩৭ অপরাহ্ন
রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অধিগ্রহণ করা সরকারি জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান সানভিউ টাওয়ার্সের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, আদালতে মামলা চলমান থাকা এবং রাজউকের অভিযান সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি বিতর্কিত জমিতে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি নথি জালিয়াতি ও ভূমি-সংক্রান্ত রেকর্ডে অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পল্লবী থানার বাউনিয়া মৌজার সিএস ৩১২৪ ও ৩১২৮ দাগসহ প্রায় ১৬৮ একর জমি সরকারের অধিগ্রহণ করা সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৬৫ একর এলাকায় এবং সিএস ৩১২৪ দাগের প্রায় ৩ একর জমি সানভিউ টাওয়ার্স দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ ও ফ্ল্যাট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দাবি, অধিগ্রহণকৃত জমিকে নিজেদের ক্রয়কৃত সম্পত্তি হিসেবে উপস্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি একাধিক ভবন নির্মাণ করেছে। একটি ভবনের নির্মাণ শেষ হওয়ার পর স্বপ্ননগর-২ সরকারি প্রকল্পের সীমানা ঘেঁষে আরও একটি বহুতল ভবনের কাজ চলমান রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়ে অবৈধ ও নকশাবহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ রাজউককে চিঠি দেয়। পরে রাজউক পল্লবী থানা পুলিশের সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করলেও অভিযোগ রয়েছে, অভিযানটি সীমিত পরিসরে শেষ হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযানের পরদিন সানভিউ টাওয়ার্সের প্রতিনিধিরা রাজউক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ঘটনায় অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, অধিগ্রহণকৃত জমিকে নিজেদের সম্পত্তি দাবি করায় সানভিউ টাওয়ার্সের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়েছে। তবে মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সংরক্ষিত মূল রেকর্ড বইয়ের সংশ্লিষ্ট অংশ ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে সানভিউ টাওয়ার্সের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত কাগজপত্রের ভিত্তিতেই জমির মালিকানা দাবি করছে।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বে সরকারি মডেল মসজিদ নির্মাণের জন্য নির্ধারিত একটি স্থানও বর্তমানে দখলের আওতায় এসেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে সরকারি জমি নিজেদের নামে দাবি করার অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাজউককে চিঠি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, মিরপুর এলাকায় প্রতি শতাংশ জমির সরকারি মূল্য প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক একর জমির মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রায় ৩ একর জমি দখলের ফলে শতকোটি টাকার সরকারি সম্পদ বেদখলে রয়েছে। এছাড়া সিএস ৩১২৪ ও ৩১২৮ দাগভুক্ত প্রায় ২০ একর সরকারি জমিও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জমি উদ্ধারে গেলে গৃহায়নের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হামলার মুখেও পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গৃহায়নের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় সানভিউ টাওয়ার্স কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জমি উদ্ধারে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি কর্মকর্তারা বাধার মুখে পড়েন বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজউকের অথরাইজড অফিসার এফ আর আশিক আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুরোধে নিয়ম অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানের সময় সানভিউ টাওয়ার্স বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি বলেও তিনি জানান। সীমিত পরিসরে অভিযান পরিচালনার বিষয়ে তিনি বলেন, সেদিন একাধিক স্থানে অভিযান চলছিল এবং অভিযানের পরিধি ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
অন্যদিকে সানভিউ টাওয়ার্সের সভাপতি সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, তারা সাগুফতা কোম্পানির মালিক জুয়েল মোল্লার কাছ থেকে ২০২২ সালে জমিটি ক্রয় করেছেন। তার দাবি, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ জমির মালিকানা দাবি করলেও তাদের কাছে ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে।
রাজউকের অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অনুমোদিত নকশার তুলনায় কিছু অতিরিক্ত নির্মাণ হওয়ায় রাজউক আংশিক ভাঙচুর করেছে। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তারা রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলেও উল্লেখ করেন।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, যে জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে সেটি সরকারের অধিগ্রহণ করা সম্পত্তি এবং বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। তার দাবি, জমিটির ওপর সানভিউ টাওয়ার্সের মালিকানার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, বিতর্কিত জমিটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন এবং মামলার নিষ্পত্তির আগেই সেখানে নির্মাণকাজ পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি জমি দখল ও নকশাবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগে রাজউককে পুনরায় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সরকারি জমি রক্ষায় আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।