সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৮ অপরাহ্ন
নরেন্দ্র মোদির মার্কিন সফর: ট্রাম্পের সঙ্গে গোপন সমঝোতা, বিতর্ক এড়িয়ে নতুন বাণিজ্য পরিকল্পনা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ১২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে দু’দিনের সফরে যুক্তরাষ্ট্রে যান। যদিও এই সফর ছিল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের, তবে পর্দার আড়ালে একাধিক বিতর্কিত ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে কিছু গোপন সমঝোতা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ব্যবস্থায় টানাপোড়েন তৈরি করেছে। মোদির সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে কিছু ছাড় আদায় করা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, যা ট্রাম্পের জন্য একটি রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
বৈঠকের পর দুই নেতা ঘোষণা দেন, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বেশি পরিমাণে জ্বালানি পণ্য আমদানি করবে। পাশাপাশি, মহাকাশ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং জ্বালানি উৎপাদনে অংশীদারত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মোদি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।’
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা একসঙ্গে ইতিহাসের অন্যতম বড় বাণিজ্য পথ গড়ে তুলতে যাচ্ছি, যা ভারত থেকে ইসরায়েল, ইতালি হয়ে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আসলে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) পাল্টা হিসেবে পরিকল্পিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোরের (IMEC) পুনর্জাগরণ।
এই প্রকল্পের মধ্যে থাকছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং গ্রিস। যদিও ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের কারণে এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তবে ট্রাম্প-মোদির বৈঠকে এ বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।
ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (MAGA) স্লোগান বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। মোদি এই ধারণাকে ভারতীয় রূপ দিলেন—‘মেক ইন্ডিয়া গ্রেট অ্যাগেইন’ (MIGA)। এমনকি তিনি এটিকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে বলেন, ‘যখন মাগা ও মিগা একসঙ্গে আসে, তখন এটি মেগা অংশীদারত্ব হয়ে যায়।’
এটি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচন প্রচারণায় মোদির পরোক্ষ সমর্থন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মোদি নিজেও বিজেপির ‘ভারত ফার্স্ট’ নীতিকে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
বৈঠকে চীন ইস্যুর পাশাপাশি ‘সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলা নিয়েও আলোচনা হয়। এর অংশ হিসেবে ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার সঙ্গে জড়িত শিকাগোর ব্যবসায়ী তাহাওয়ার রানার প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করেন ট্রাম্প।
রানা ২০১৩ সালে সন্ত্রাসী সংগঠনকে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে ১৪ বছরের কারাদণ্ড পান, কিন্তু মুম্বাই হামলার দায়ে সরাসরি অভিযুক্ত হননি। তবে ভারত চায় তার বিচার নিজ দেশে করতে। মোদি ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র এখন আরও একতাবদ্ধ।’
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, তবে সাংবাদিকরা বারবার ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পকে চেপে ধরেন। ট্রাম্প বলেন, ‘রাশিয়া বহু বছর ধরেই ইউক্রেনের ন্যাটোর অংশ হওয়া মেনে নেয়নি, এটি যুদ্ধের মূল কারণ।’
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থান ভারতের জন্য স্বস্তিদায়ক, কারণ মোদির সরকার রাশিয়ার কাছ থেকে ব্যাপক তেল ও অস্ত্র আমদানি করে এবং বাইডেন প্রশাসনের সময় ভারতকে এই ইস্যুতে প্রবল চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল।
বৈঠকে যদিও বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ট্রাম্পের শুল্কনীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সংখ্যালঘু নিপীড়নের মতো বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে সাম্প্রতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না, বরং বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারত্বই মুখ্য হয়ে উঠছে।
ট্রাম্প-মোদির বৈঠক আসলে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এই সফরে বিতর্কিত ইস্যুগুলো পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের মিত্রতা আরও শক্তিশালী করতে মোদি সফল হয়েছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্পর্ক কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনের বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর।