শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৪ অপরাহ্ন
ছেলেবেলায় আলবার্ট আইনস্টাইনকে নিয়ে তাঁর বাবা-মা ভীষণ চিন্তিত ছিলেন। কারণ, তিনি তিন-চার বছর বয়স পর্যন্ত ‘স্পিকটি নট’ ছিলেন। একদিন খাবার টেবিলে হঠাৎ করে তিনি বললেন, ‘স্যুপটা খুব গরম!’
এতে মা-বাবা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন, ‘এতদিন তুমি কথা বলোনি কেন?’
আইনস্টাইনের দ্বিতীয় কথা ছিল, ‘এতদিন তো সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল।’
তবে সবার ছেলেবেলা আইনস্টাইনের মতো সোজা নয়। তাই কথা আমাদের বলতেই হয়। কিন্তু আদতে কি ছোটবেলায় আমরা কথা বলতে পারি? না, পারেনা। প্রথমে আমরা বড়দের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি। তারপর তাঁদের অনুকরণ করতে করতেই কথা বলাটা শিখে ফেলি। এরকমই টিয়া ও টিয়ার মতো কিছু পাখি মানুষের কথা নকল করে। কিন্তু অন্য পাখিগুলো কীভাবে শব্দ করতে শেখে? গাইতে পারেও কীভাবে?
কেউ ডাকে, কেউ গায়। মানুষ ও পাখি ছাড়া বাকিদের শব্দ করা আসলে শিখতে হয় না। কুকুরছানা যেমন সহজেই ঘেউ ঘেউ করে। বিড়ালছানা ডাক দেয় মিউ মিউ, গরুর বাছুর ডাকে হাম্বা, ছাগলছানা চেঁচায় ম্যাঁঅ্যাঅ্যা। আর পাখিরা? হাঁসের প্যাঁক প্যাঁক, মুরগির কক কক। এরা জন্মগতভাবে জানে, কীভাবে ডাকতে হবে। ফলে তুমি এমন কোনো হাঁস পাবেনা, যে কু কু করে ডাকে। এমন কোনো মুরগিও দেখবেনা, যে প্যাঁক প্যাঁক করছে।
পাখির একটানা সুরেলা কিচিরমিচিরকে আমরা গান বলি। এই গান গাওয়া পাখিগুলো কি জন্ম থেকেই জানে, কীভাবে গাইতে হবে? মার্কিন পাখি গবেষক মেরি স্যু ওয়াসার ও তাঁর সহকর্মীরা এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজছিলেন। পাখি ও তাদের গানের ওপর কিছু পরীক্ষা চালিয়ে তাঁরা কিছু পাখির ছানাকে মা-বাবা ছাড়া বড় হতে দেন। এই ছানাগুলো কখনোই কোনো বড় পাখি দেখেনি এবং তাদের গানও শোনেনি। গবেষকেরা একসময় দেখেন, ছানাগুলো গানের মতো কিছু গাইতে চেষ্টা করছে! সত্যি বলতে, গান শিখতে শেষে নিজ প্রজাতির একটি বড় পাখিকেই ‘ওস্তাদ’ মানতে হলো। বড় পাখির কাছ থেকেই তারা শিখল, কীভাবে গলার স্বর পরিবর্তন করতে হয়। তারপর সত্যি সত্যি একদিন তারা সবাই মিলে গাইতে শুরু করল সুরেলা গান!
পাখি কেন গায়? আমরা গান গেয়ে অন্যের হাততালি পাই (বেসুরো হলে কেউ কেউ পচা ডিমও পায়)। কিন্তু পাখি গান গেয়ে সঙ্গী খোঁজে। গান গেয়েই অন্যদের জানান দেয়—এই এলাকা আমার। এ কারণেই প্রতিটি পাখিকে নিজের জাতের গান জানতে হয়।
বসন্তকালে অনেক পাখির ডাক আমাদের কানে আসে। পাখির ছানারাও চারপাশে হাজারো পাখির গান শোনে। তাহলে ওরা কীভাবে ঠিক করে কোন গান অনুকরণ করতে হবে? পাখির ডাক নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন দুই ইংরেজ-আমেরিকান বিজ্ঞানী—পিটার মারলার ও সুসান পিটার্স। তাঁরা দেখেছেন, একেক পাখি তার নিজের গান নির্বাচন করতে গিয়ে একেক রকম পথ বেছে নেয়। গবেষকরা কিছু জলচড়ুইয়ের ছানাকে মা-বাবা ছাড়া বড় করে তুলেছিলেন। অন্য কোনো পাখির গানই তাদের শুনতে দেওয়া হয়নি। তারপর ছানাগুলোকে জলচড়ুই ও মেঠোচড়ুইয়ের গান বাজিয়ে শোনানো হলে দেখা যায়, তারা কেবল নিজেদের জাতের গানই গাইতে শিখেছে! ভুল করেও মেঠোচড়ুইয়ের গান শেখেনি!
পিটার ও সুসান তারপরও হাত গুটিয়ে ফেলেননি। তাঁরা দেখতে চাইলেন, পাখির ছানাগুলো কি গান শুনেই নিজেদের গান বাছাই করে? তাই জলচড়ুই ও মেঠোচড়ুইয়ের ‘খিচুড়ি সংগীত’ রেকর্ড করলেন। জলচড়ুইয়ের সুরের সঙ্গে মেঠোচড়ুইয়ের তাল যুক্ত করে। আবার মেঠোচড়ুইয়ের সুরের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন জলচড়ুইয়ের তাল।
বুঝতেই পারছ, পরীক্ষাটি বেশ জটিল। তবে অবাক করা বিষয় হলো, দুই রকম গানের জগাখিচুড়ি রেকর্ডিং থেকেও জলচড়ুইয়ের ছানারা নিজেদের গানটা ঠিকই বের করে ফেলল! শিখেও নিল পুরোটা। মানে ছোট্ট পাখির জন্মগত প্রবণতাই তাকে বলে দিল, কোনটা তার নিজস্ব গান।
কেউ কেউ শিল্পী। তবে কিছু পাখি গান শেখা নিয়ে অত খুঁতখুঁতে নয়। বিজ্ঞানীরা কিছু লালডানা ব্ল্যাকবার্ডের ছানাকে বড় হতে দেন। এরপর ওদের শোনানো হয়েছিল দুই প্রকার পাখির গানের দুটি রেকর্ড। একটি রেড উইংড ব্ল্যাকবার্ডের গান, অন্যটি ওরিয়ল পাখির। ছানাগুলো দুই জাতের পাখির গানই গাইতে শিখল! তবে বনে-বাদাড়ে থাকলে ওরা কেবল নিজেদের গানই গাইতে শিখত।
কিছু প্রজাতির ছানা আবার বাবার কাছে গাইতে শেখে। বিজ্ঞানীরা বিষয়টি জানেন বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। ছোট বুল ফিঞ্চ আর জেব্রা ফিঞ্চ পাখির ওপর একটি কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। দুই প্রজাতির পাখির ছানাগুলোর কাছ থেকে তাদের আসল বাবাকে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল। বদলে তাদের সঙ্গে রাখা হয়েছিল ভিন্ন প্রজাতির দুটি বাবা-পাখি। দেখা গেছে, ছানাগুলো নকল বাবার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে এবং নকল বাবার গান গাইতেও শিখেছে!
বুঝতেই পারছেন, গান শেখার ক্ষেত্রে একেক পাখির একেক কায়দা। তবে কিছু পাখি একেবারে অদ্ভুত। তারা ইচ্ছা করে অন্য প্রাণীর ডাক শিখে নেয়। এদের ‘হরবোলা’ পাখি বলা হয়। যেমন, বাংলাদেশে রয়েছে নীলডানা পাতা বুলবুলি। এরা অন্য পাখির ডাক뿐 নয়, অন্য প্রাণীর ডাকও নকল করতে পারে!
তবে, হরবোলা পাখি কেন অন্যের ডাক নকল করে? বিজ্ঞানীরা এর উত্তর খুঁজছেন।
সূত্র: হাউ ডু বার্ডস লার্ন