শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৩ পূর্বাহ্ন
ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত রাজনীতি, শেষমেশ আইনের জালে!
অনলাইন ডেস্ক
কুড়িগ্রামের উলিপুর ও ফুলবাড়ী উপজেলায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নাটকীয় মোড় নিয়েছে, যখন ছাত্র-জনতার উপর হামলার মামলায় পুলিশ দুই প্রভাবশালী যুবলীগ নেতাসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে। এই গ্রেফতারগুলো শুধু আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশ নয়—এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, গোপন রাজনৈতিক দোহাই এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা আত্মগোপনের একটি জ্বলন্ত দলিল।
শুক্রবার, ৯ মে দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালায় উলিপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় উলিপুর পৌরসভার হায়াৎখাঁন গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে এবং উপজেলা যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম বিটুকে, যার বয়স ৫২ বছর। এর ঠিক একদিন আগে, বৃহস্পতিবার ৮ মে (প্রতিবেদন অনুযায়ী পূর্বে ভুলক্রমে “৮ এপ্রিল” উল্লেখ ছিল), দুপুর ৩টার দিকে ফুলবাড়ী উপজেলার কদমতলা বাজার থেকে ধরা পড়েন নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের যুবলীগ সভাপতি আতিকুর রহমান নয়ন, বয়স ৪৭। নয়নের গ্রেফতার ছিল আরও নাটকীয়—শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এতদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকা নয়নকে একেবারে জনবহুল বাজার এলাকা থেকে হাতেনাতে ধরে ফেলে পুলিশ।
এই গ্রেফতারগুলো মূলত ২০২৩ সালের ১৮ জুলাইয়ের একটি ভয়াবহ ঘটনার জেরে। ওই দিন দুপুরে উলিপুরের মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল এন্ড কলেজ এবং মসজিদুল হুদার সামনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছাত্রদের উপর অতর্কিতে চড়াও হয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, হামলাকারীরা লাঠি, লোহার রড, হকি স্টিক, রাম দা, ছোড়া এবং বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। তারা শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। সেই ঘটনার পরপরই শিক্ষার্থী মোসাব্বির হোসেন বাদী হয়ে ২১ নভেম্বর উলিপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে ৪৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ১৮০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
পুলিশ জানায়, আমিনুল ইসলাম বিটু এই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত এবং ঘটনার পেছনে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। তাকে আদালতে হাজির করে কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একই মামলার একাধিক আসামির খোঁজে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ফুলবাড়ীতে ছাত্র-জনতার ৪ আগস্টের একটি বিক্ষোভ মিছিলে সশস্ত্র হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের করা ৫ নম্বর মামলায় গ্রেফতার করা হয় আতিকুর রহমান নয়নকে। নয়ন ছিলেন এমন একজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, যিনি শুধু যুবলীগের নেতৃত্বেই ছিলেন না, বরং এলাকায় তার প্রভাবশালী অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার নির্ভরযোগ্য ছায়ার মতো কাজ করেছে। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবশেষে তাকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে।
এই নাটকীয় অভিযানে নয়ন ছাড়াও আরও চারজনকে গ্রেফতার করা হয়—গোরক মণ্ডল এলাকার বেলাল হোসেনের ছেলে মো. আল-আমিন, জাফর আলীর ছেলে হাসছেন আলী, নজরুল মিয়ার ছেলে আব্দুর রাজ্জাক এবং তালুক শিমুলবাড়ী এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে শরিফুল ইসলাম সাগর। ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম নিশ্চিত করেন, এই পাঁচজনকেই আদালতের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এই গ্রেফতার অভিযানগুলো শুধু রাজনৈতিক দলীয় দ্বন্দ্ব নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলা ছাত্র-জনতার ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সাধারণ জনগণের প্রশ্ন, কতদিন আর রাজনৈতিক ছায়ায় দোষীরা রক্ষা পাবে? এ অভিযান কি কেবলই আইনি কার্যক্রম, না কি আরও গভীরে লুকিয়ে থাকা জবাবদিহিতার ইঙ্গিত? স্থানীয় মানুষজন আশাবাদী হলেও, এখন অপেক্ষা শুধু ন্যায়বিচার আর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির।