সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৫ পূর্বাহ্ন
রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি দালাল। এরা গ্রাহকের কাগজপত্র কৌশলে হাতিয়ে নিয়ে দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। শুধু দালাল চক্রই নয়, পাসপোর্ট অফিসে দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যরাও ‘তাৎক্ষণিক সেবা’ দেওয়ার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন। আর এ দুর্নীতির মূল উৎস হলো পাসপোর্ট অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা বিভিন্ন অজুহাতে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করছেন, যেখানে দালাল ও পুলিশের মাধ্যমে কাজ করানো ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। সরেজমিনে তিন দিনের অনুসন্ধানে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
অনেক সেবাপ্রার্থী অভিযোগ করেছেন, সরকারি নিয়মে যারা পাসপোর্ট করতে চান, তারা নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। দিনকে দিন তাদের কাজ ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। কিন্তু এ অনিয়ম দেখার যেন কেউ নেই। বেশ কয়েকজন সেবাপ্রার্থী জানান, এ অফিসে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা সরাসরি এ চক্রের সঙ্গে জড়িত। দালালদের পাশাপাশি তাদের মাধ্যমেও টাকা নিয়ে কাজ করা হয়। আজ সার্ভার সমস্যার অজুহাত, কাল নেটওয়ার্কের সমস্যা—এভাবে তাদের ঘুরানো হয়। অথচ দালালকে ১৫০০ টাকা দিলেই সব কাজ সহজে হয়ে যায়।
গত বুধবার, বৃহস্পতিবার ও রোববার (১ ডিসেম্বর) গ্রাহক সেজে পাসপোর্ট অফিসে দালাল ও আনসার সদস্যদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছেন প্রতিবেদক। বৃহস্পতিবার দুপুরে রেজা নামের এক দালাল প্রতিবেদককে জানান, ‘পাঁচ বছরের জন্য পাসপোর্ট করাতে চাইলে আমরা ৬ হাজার টাকা নিই। এই টাকার বিনিময়ে আপনাকে কোনো ঝামেলায় পড়তে হবে না। শুধু ছবি তুলতে এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে আসবেন।’
রেজা আরও জানান, ‘৪ হাজার ২৫ টাকা ব্যাংক ড্রাফটের জন্য লাগে। অফিসের জন্য দিতে হয় ১২০০ টাকা এবং আমার কমিশন থাকবে ৫০০ টাকা।’ তার মতো আরও অনেক দালাল, যেমন তারেক, পলাশ, জাহাঙ্গীর, এ অফিসের কর্মচারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। একজন দালাল দিনে চার-পাঁচটি কাজ করায় প্রায় ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় করে।
এ ছাড়া পাসপোর্ট অফিসের প্রধান ফটকের আনসার ও পুলিশ সদস্যরাও গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ করেন। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত প্রধান ফটকে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য কামালের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা যায়, তিনি অন্তত তিনজন গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ করিয়ে দেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ‘আমি কোনো টাকা নিইনি। শুধু মাঝে মাঝে গ্রাহকদের সহযোগিতা করি।’ তবে রোববার জানা যায়, ওই পুলিশ সদস্য অন্যত্র বদলি হয়েছেন।
ফটকের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য শহিদুলও একইভাবে কাজ করেন। গ্রাহক সেজে দ্রুত পাসপোর্ট করার জন্য শহিদুলের কাছে খরচ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১২০০ টাকা লাগবে। তবে এই টাকা আমি রাখি না। যেখানে কাজ হয়, সেখানেই দিই।’
তথ্যসূত্র অনুযায়ী, পাসপোর্ট করতে আসা অনেক গ্রাহক তাদের জন্মসনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের গরমিলের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন। প্রতিদিন প্রায় দুই শতাধিক আবেদন এনরোলমেন্ট হলেও এক তৃতীয়াংশেরই তথ্য সংশোধন প্রয়োজন হয়। পাসপোর্ট আবেদনের ৫০ শতাংশই চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। জরুরি প্রয়োজনে সেবা পেতে সেবাপ্রার্থীরা বাধ্য হয়ে দালালের সহযোগিতা নিচ্ছেন। ফলে দালাল চক্র আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।
সরকারি কর্মচারী আব্দুল কাদের জানান, তার স্যারের পাসপোর্ট করতে গিয়ে প্রথমে উপপরিচালকের কাছে যান। কিন্তু তিনি তাদের সহযোগিতা করেননি। বাধ্য হয়ে ১৫০০ টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে কাজ করান। দালাল মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে পাসপোর্ট পৌঁছে দেন। তিনি বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসে দালালের মাধ্যমে টাকা দিলে দ্রুত কাজ হয়। নইলে ভোগান্তি পোহাতে হয়।’
রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক রোজি খন্দকার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ডিজির অনুমতি ছাড়া কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’ তবে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘পুলিশ ও আনসার সদস্যরা আমার অধীনে নয়। তথ্যপ্রমাণ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তা পেশ করতে পারি। আমার অফিসের কেউ অনিয়মে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’