রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৬:৫২ অপরাহ্ন
রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে বিএনপি নতুন করে সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করতে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে দলের পক্ষ থেকে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়েছিল। বর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এসব প্রস্তাব নিয়ে তৃণমূল এবং নীতিনির্ধারণী স্তরে আলোচনা করছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরে একটি সংবাদ সম্মেলনে নতুন রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাব প্রকাশ করবেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এই প্রস্তাব সারা দেশে প্রচার করা হবে। লিফলেট, বুকলেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের কাছে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হবে। এজন্য ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। তারেক রহমান বিশ্বাস করেন, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হলো জনগণ। তাই জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে আগামীতে বিএনপি সব কার্যক্রম গ্রহণ করবে। দলীয় সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতিদিন মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা, বিভাগ ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। এ কর্মসূচির আওতায় জনগণকে আরও কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, সে বিষয়গুলো নিয়ে তিনি নির্দেশনা দিচ্ছেন। এই প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো: প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা, বাকস্বাধীনতা, শিক্ষাব্যবস্থা, শ্রমঘন শিল্প গড়ে তোলা, রাজনৈতিক সংঘাত চিরতরে বন্ধ করা। এর পাশাপাশি রাষ্ট্র মেরামত তথা সংস্কারের সকল বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যেন আর কখনো রাজনৈতিক সংঘাত, কর্তৃত্ববাদী শাসন, বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো নষ্ট করার সুযোগ না পায়, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবে সেই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিএনপি পূর্বে ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে আরও সংযোজন, বিয়োজন এবং পুনর্বিন্যাস করে এবার নতুন রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে লিফলেট আকারে, নারীদের জন্য আলাদা করে এবং বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য বুকলেট তৈরি করে বিতরণ করা হবে। জানা গেছে, রাষ্ট্র মেরামতে একটি পূর্ণাঙ্গ যুগোপযোগী সংস্কার প্রস্তাব তৈরির লক্ষ্যে বিএনপির হাইকমান্ড তারেক রহমান ইতোমধ্যে ছয়টি শক্তিশালী কমিটি গঠন করেছেন। কমিটিগুলো তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। কমিটির কার্যক্রম শেষে সেগুলো একত্রিত করে দলের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করা হবে। এরপর তা জনসমক্ষে প্রকাশিত হবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানসহ সরকারের ছয়টি সংস্কার কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
ছয়টি কমিটিতে যারা আছেন: কমিটির মধ্যে সংবিধান পুনর্গঠন কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে। সদস্য হিসেবে আছেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন, অধ্যাপক ড. মাহফুজুল হক সুপন ও অধ্যাপক ড. নাজমুজ জামান ভূঁইয়া ইমন। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে নিয়োগ করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে আছেন- অ্যাডভোকেট জয়নাল আবদিন, বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী, বিচারপতি মোহাম্মদ রইস উদ্দিন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, বিচারক ইকতেদার হোসেন, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসিম।
পুলিশ বিভাগ সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম। সদস্য হিসেবে থাকছেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জহিরুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি আবদুল কাইউম, সাবেক ডিআইজি খোদা বক্স ও সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান।
প্রশাসন সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সদস্য হিসেবে আছেন- সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আবদুল হালিম, সাবেক সচিব ইসমাইল জবিউল্লাহ ও মনিরুজ্জামান খান।
দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক সাবেক বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী, বিচারপতি শরফুদ্দিন চাকলাদার ও বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমান। সদস্য হিসেবে আছেন- ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল ও সাবেক সচিব আবদুর রশিদ।
নির্বাচন কমিশন বিষয়ক সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক সচিব ইসমাইল জবিউল্লাহ ও আবদুর রশিদ। ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কর্তৃক উপস্থাপিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা ছিল যথাক্রমে: ১. জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন। ২. সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্রসত্তা (Rainbow-Nation) ও জাতীয় সমন্বয় কমিশন (National Reconciliation Commission) গঠন।
৩. অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন। ৪. আইনসভা, মন্ত্রিসভা, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। ৫. প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময়সীমা অনূর্ধ্ব পরপর দুই মেয়াদ নির্ধারণ। ৬. বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে আইনসভায় উচ্চকক্ষের প্রবর্তন। ৭. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন। ৮. নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি সংশোধন। ৯. স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের জন্য সব রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও শক্তিশালীকরণ। ১০. বর্তমান বিচারব্যবস্থার সংস্কারের জন্য জুডিশিয়াল কমিশন গঠন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনঃপ্রবর্তন এবং সংবিধানের আলোকে বিচারপতি নিয়োগ আইন প্রণয়ন। ১১. গণমুখী ও জনকল্যাণমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন। ১২. মিডিয়া কমিশন গঠন করে তথ্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ। ১৩. দুর্নীতি প্রতিরোধে দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ন্যায়পাল নিয়োগ। ১৪. সর্বস্তরে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা। ১৫. আত্মনির্ভরশীল জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন। ১৬. ধর্মীয় স্বাধীনতার সর্বোচ্চ ও কার্যকর নিশ্চয়তা প্রদান। ১৭. মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধির আলোকে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা। ১৮. প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং নবায়নযোগ্য ও মিশ্র জ্বালানি ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাত আধুনিকায়ন। ১৯. জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করে বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়ন। ২০. প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা। ২১. প্রশাসন ও সেবা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বশাসিত ও ক্ষমতাবান করা। ২২. শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রদান। ২৩. কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে আধুনিক ও যুগোপযোগী যুব উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও বেকার ভাতা প্রবর্তন