শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১৯ পূর্বাহ্ন
টিটুর গ্রেফতারে রাজনীতি উত্তপ্ত, চাঞ্চল্যকর সব তথ্য প্রকাশ্যে!
গোলাম কিবরিয়া, রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটুকে এক নাটকীয় অভিযানে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাজনীতি, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী চক্রের ঘনিষ্ঠ এই নামটি সম্প্রতি আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে যখন জানা যায়, টিটু আত্মগোপনে ছিলেন দীর্ঘ নয় মাস—সরকার বদলের পর থেকেই।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার (৯ মে) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলার এক গ্রাম্য বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। বাড়িটি ছিল সাগর চৌধুরী নামের স্থানীয় এক বিএনপি নেতার, যিনি বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা এবং নওগাঁ জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতিও বটে। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে—টিটুকে আশ্রয়দাতা এই সাগর, সাবেক ডেপুটি স্পিকার আক্তার হামিদ সিদ্দিকীর ছেলে ও বিএনপি নেতা আরেফিন সিদ্দিকী জনির অনুসারী হিসেবে পরিচিত, যিনি মহাদেবপুর-বদলগাছি আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী। এমন রাজনৈতিক বিপরীতমুখী অবস্থানে থেকেও টিটুকে আশ্রয় দেওয়া, ঘটনাটিকে করেছে আরও রহস্যঘেরা।
বদলগাছি থানার পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা অভিযান চালিয়ে চাকরাইল চৌধুরীপাড়া গ্রামে সাগরের বাসা থেকে টিটুকে গ্রেফতার করে। সাগর চৌধুরীকেও আটক করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। পুলিশ পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম জানান, সাগর চৌধুরী বিএনপির ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তবে শুনেছেন তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত—এই তথ্য যাচাই হচ্ছে।
টিটুর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) একজন সেকশন অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি পাঁচ বছর ধরে কোনো ছুটি না নিয়েই মেয়র লিটনের পিএ হিসেবে কাজ করেছেন, এবং এই সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও করপোরেশন—উভয় জায়গা থেকেই বেতন নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে সরকারি চাকরি বিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে তার কেলেঙ্কারির এখানেই শেষ নয়। জানা গেছে, টিটু শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তিনি জড়িয়ে পড়েন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, জমি দখল, কিশোর গ্যাং লালন-পালন এবং চাঁদাবাজির মতো অভিযোগে। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু জহিরুল হক রুবেল, যিনি গত বছরের ৫ আগস্ট দুই হাতে পিস্তল নিয়ে জনতার ওপর গুলি চালিয়ে ভাইরাল হয়েছিলেন—তিনিও ছিলেন এই চক্রের অন্যতম মুখ। সাকিব আনজুম নামে এক যুবকের হত্যার পেছনেও এই চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। সেই হত্যাকাণ্ডের মামলায় টিটু একজন অভিযুক্ত। এছাড়া ছাত্রদের ওপর হামলার একটি মামলারও এজাহারভুক্ত আসামি তিনি।
রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার ওসি মোস্তাক আহম্মেদ জানান, টিটুকে বদলগাছী থানা থেকে হস্তান্তরের পর তাকে রাজশাহীর দুই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হবে। পাশাপাশি তদন্ত চলছে, তার নামে আরও কোনো মামলা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাফিউল সারোয়ার জানান, বিএনপি নেতা সাগর চৌধুরী কেন টিটুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে ক্ষমতাসীন দলের এক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠজন, অন্যদিকে বিরোধী দলের একজন নেতার আশ্রয়ে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তি—এই অদ্ভুত সমীকরণ ভবিষ্যতের রাজনীতিতে কী ইঙ্গিত বহন করছে তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। টিটুর গ্রেফতার কেবল একজন দুর্নীতিপরায়ণ রাজনৈতিক কর্মীর পতন নয়, বরং রাজনীতির ছায়াতলে লালিত অপরাধের জটিল চিত্রকে উন্মোচিত করল—যেখানে দলীয় পরিচয়, নীতি কিংবা আদর্শের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ব্যক্তিস্বার্থ আর ক্ষমতার খেলা।
আরও তদন্তের মাধ্যমে বের হয়ে আসতে পারে অনেক অজানা তথ্য, যা রাজশাহীসহ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে।