শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন
রাজবাড়ীতে গুলি, ছাত্রদের পাশে এবার জনতার জাগরণ
মিজানুর রহমান, রাজাবাড়ী জেলা প্রতিনিধি
রাজবাড়ীর রাজনীতি যেন ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রেশ ধরে। সেই আন্দোলন ঘিরেই ঘটেছে একের পর এক হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা—আর এবার সেইসব ঘটনার পেছনের শক্তিধর রাজনৈতিক নামগুলোকে আইনের আওতায় আনতে শুরু করেছে পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্য ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে শুক্রবার (৯ মে) রাজবাড়ীতে চালানো বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার করা হয়েছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং জেলা পর্যায়ের তিন নেতা ও ছাত্রলীগের নামে পরিচালিত নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি সংগঠনের এক নেতাকে।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আমজাদ হোসেন, যিনি বয়সের ষাটে পা রেখেও স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এবং পরিচিত মুখ। একই সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর আবু হাসান (৩৮), এবং পাংশা উপজেলার কলিমহর ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আমিরুল ইসলাম (৫৮)। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর নামটি হলো ছাত্র রাজনীতির একটি নিষিদ্ধ শাখার নেতা আজিজুল ইসলাম মণ্ডল (২৭), যিনি গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নে ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই চারজনের প্রত্যেকেই সংশ্লিষ্ট আন্দোলন চলাকালীন সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পুলিশ হেফাজতে।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি মো. মফিজুল ইসলাম জানান, ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড়ে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার জের ধরে শাহিন ফকির নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে ২ অক্টোবর রাজবাড়ী সদর থানায় একটি বিস্তৃত মামলা দায়ের করেন, যেখানে নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয় ৮৭ জনকে, এবং অজ্ঞাতনামা হিসেবে রাখা হয় আরও প্রায় ২০০ জনকে।
এটাই শেষ নয়। রাজবাড়ী সদর থানার ওসি মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, এর আগের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট সকালেও শহরের টিএনটি এলাকায় আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় শিক্ষার্থী উৎস সরকার ২৬ আগস্ট থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে নাম উঠে আসে ৪৪ জনের এবং অজ্ঞাতনামা শতাধিক ব্যক্তির।
অন্যদিকে, গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম বলেন, একই দিনে—অর্থাৎ ৪ আগস্ট—গোয়ালন্দ রেলগেট এলাকাতেও আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে শরিফুল ইসলাম নামের আরেক শিক্ষার্থী ১০ ডিসেম্বর থানায় মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় উল্লেখ রয়েছে ৫৯ জনের নাম, এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এইসব মামলার তদন্তে উঠে এসেছে, সংগঠিতভাবে আন্দোলন দমন করতে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহল সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। আর তারই ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশেষে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এটা কি কেবল আইনি প্রক্রিয়ার সূচনা, না কি রাজবাড়ীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বড় ধাক্কার শুরু? এমন সময়, যখন দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন নতুন করে মুখ তুলছে, তখন এই গ্রেফতার অভিযান সরকার ও দলীয় রাজনীতির প্রতি এক গভীর দৃষ্টিপাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।