শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে ছাত্র-জনতা হত্যার সাথে জড়িত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগী মন্ত্রী-এমপিসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বিষয়ে বিএনপি প্রশ্ন তুলেছে যে, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে কিভাবে দেশ ত্যাগ করলেন। একই সঙ্গে, গণ-অভ্যুত্থানের দুই মাস পর যারা গণহত্যায় অভিযুক্ত হয়ে ইতোমধ্যে হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন, তারা কেন গ্রেফতার হচ্ছেন না—এই প্রশ্নও উঠেছে দলের নেতাদের মধ্যে।
দলটির নীতিনির্ধারণী সূত্র জানাচ্ছে, মঙ্গলবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কিছু সদস্য এসব বিষয়ে আলোচনা করেন। তারা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব (শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা) কিভাবে পালিয়েছেন, সে বিষয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এই বিষয়টি সরকারের কাছে জানতে চান তারা।
বৈঠকে প্রায় ১৬ বছর ধরে বিএনপিসহ অন্যান্য আন্দোলনকারী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা ও গায়েবি মামলা প্রত্যাহারের বিষয়েও আলোচনা হয়। তারা মন্তব্য করেন, এসব মামলার সাজা প্রসঙ্গেও সরকারের দৃষ্টি এখনও নেই বলে মনে হচ্ছে, যা দুঃখজনক।
কমিটির একজন সদস্য জানান, তারা সংবাদমাধ্যমে দেখেছেন যে, শেখ হাসিনা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ অনেকেই বিদেশে পালিয়ে গেছেন। তাদের কাউকে ভারতের বিভিন্ন মাজার ও পার্কে দেখা গেছে। বিএনপির নেতারা উদ্বিগ্ন, হত্যাকাণ্ডের পরেও এসব আসামি কিভাবে পালালেন এবং কারা তাদের সাহায্য করল, এসব বিষয়ে জনমনে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী একটি সূত্র জানায়, সোমবারের সভায় দেশের চলমান পরিস্থিতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা জানতে চান, দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। এছাড়া, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, সংস্কারের রোডম্যাপ কেন দেওয়া হচ্ছে না, এসব বিষয়েও বিএনপির নেতাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। বৈঠকে সরকারের ধীরগতির ব্যাপারেও আলোচনা হয়। এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা সে বিষয়ে সজাগ থাকার আহ্বান জানানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, চলমান পরিস্থিতি, সংস্কার ও নির্বাচন বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সংস্কারের জন্য ছয়টি কমিটি গঠন: বৈঠকে বিএনপি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ বিষয়ে দলীয় অবস্থান তৈরি করতে ছয়টি কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির সদস্যরা অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কার নিয়ে দলের কৌশল ঠিক করবে এবং তা জাতির সামনে তুলে ধরবে। সরকারের কাছে তাদের মতামত ও সুপারিশ জানাবে। গঠিত কমিটিগুলো হলো: সংবিধান সংশোধন, বিচার বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন।
সূত্র জানায়, মূলত সরকারের গঠিত কমিটির সংস্কার কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে দলের কৌশল তৈরি করবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করবে। সংস্কার নিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করলে বিএনপি যাতে তাদের পরামর্শ জানাতে পারে, সে প্রস্তুতিও নেবে।
বৈঠকে গঠিত ছয়টি কমিটির মধ্যে সংবিধান পুনর্গঠন কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। সদস্যরা হলেন: স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন, অধ্যাপক ড. মাহফুজুল হক সুপন ও অধ্যাপক ড. নাজমু জামান ভূঁইয়া ইমন। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারকে নির্বাচিত করা হয়েছে। সদস্য হলেন: অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী, বিচারপতি মোহাম্মদ রইস উদ্দিন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, বিচারক ইকতেদার হোসেন, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম। পুলিশ বিভাগ সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সদস্যদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জহিরুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি আবদুল কাইয়ুম, সাবেক ডিআইজি খোদা বক্স ও সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান রয়েছেন। প্রশাসন সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। সদস্যরা হলেন: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আবদুল হালিম, ইসমাইল জবিউল্লাহ ও সাবেক সচিব মনিরুজ্জামান খান। দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক হিসাবে সাবেক বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী, বিচারপতি শরফুদ্দিন চাকলাদার ও বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমানের নাম রয়েছে। সদস্য হচ্ছেন: ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল ও সাবেক সচিব আবদুর রশিদ। নির্বাচন কমিশন বিষয়ক সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। সদস্যরা হলেন: স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইসমাইল জবিউল্লাহ ও সাবেক সচিব আবদুর রশিদ।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া, অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, তা কীভাবে কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। সংস্কারের রোডম্যাপ কেন দেওয়া হচ্ছে না বা সংস্কার কবে নাগাদ হবে—এসব বিষয়েও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের কাছে আরও স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন। তারা মনে করেন, সংস্কারের সরকারের সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।
গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও এজেডএম জাহিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তারেক রহমান লন্ডন থেকে এবং মির্জা ফখরুল, আমির খসরু ও ইকবাল হাসান দেশে ও বিদেশ থেকে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন।